৫০ ভূয়া নাম-ঠিকানায় ঋণের ৯ কোটি টাকা অনাদায়ী

নিজস্ব প্রতিদেধক, ফেনী, ৫ এপ্রিল’ ২০১৮

সোনালী ব্যাংক ফেনীর মহিপাল শাখায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা খাতে (এসএমই) ঋণ প্রদানের নামে জালিয়াতির ৬ বছরেও ৫০ জন ঋণ গ্রহিতাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শনাক্ত করতে পারেনি। এসব ঋণের সুদে আসলে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। এ ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও দুদকের পক্ষ থেকে পৃথক ২১৭টি মামলা করা হয়েছে।

ব্যাংকের মহিপাল শাখা সূত্রে জানা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) ব্যবসা খাতে কিস্তিতে ১৬৫ জন ঋণ গ্রহিতাকে ৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, এসএমই (চলতি) হিসাব খাতে ১৪ জন ঋণ গ্রহিতাকে ৯০ লাখ টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসা (এসবিএল) খাতে ১৫জন ঋণ গ্রহিতাকে ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ২৭ লাখ টাকাসহ মোট আট কোটি ১৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এসব ঋণগ্রহিতারা বিভিন্ন ভুয়া নাম ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ঋণের এ টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে ।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এ তিন মাসে ওই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। যদিও ওই অর্থবছরে ব্যাংকের এ শাখায় এসএমই খাতে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার কোটি টাকা। নিয়মভঙ্গ করে ও অতিরিক্ত ঋণ প্রদানের অনুমোদন না নিয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ঋণ প্রদান করা হয়েছিল। ব্যাংকের তখনকার ব্যবস্থাপক আবুল কাশেমের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ঋণ জালিয়াতির এ ঘটনা ঘটে।

তাঁকে অন্যত্র বদলি করার পর ২০১২ সালের মার্চ মাসে নতুন ব্যবস্থাপক মো. মোস্তফা যোগদান করেন। তখনই বিষয়টি ধরা পড়ে এবং জানাজানি হয়। কিন্তু নতুন ব্যবস্থাপক মো. মোস্তফাকে যোগদানের দুই মাসের মাথায় অন্যত্র বদলি করা হয়। পরবর্তীতে ইসমাইল হোসেন মজুমদার নামে একজন ব্যবস্থাপক যোগদান করে ২০১৩ সালের ৬ আগস্ট নিজে বাদী হয়ে সাবেক ব্যবস্থাপক আবুল কাশেমসহ ৭৪জন ঋণ গ্রহিতার বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার আর কোন খোঁজ নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনাটি দুদকের নজরে আসার পর ওই বছরের ২৪ আগস্ট সাবেক ব্যবস্থাপক আবুল কাশেমসহ ৭৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে দুদক ৫৯টি মামলা আমলে নেয়। এছাড়া সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের বিভিন্ন তারিখে ফেনীর অর্থঋণ আদালত ও উপজেলা সার্টিফিকেট অফিসারের কার্যালয়ে ১৫৭টি মামলা দায়ের করে। এরমধ্যে যাদের কাছে ঋণ পাঁচ লাখ টাকার ওপরে তাদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে ১১৬টি মামলা এবং পাঁচ লাখ টাকার নীচে থাকা ঋণের জন্য উপজেলা সার্টিফিকেট কর্মকর্তার কার্যালয়ে ৪১টি মামলা রুজু করা হয়।

ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতিই মানা হয়নি। কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করা হয়েছিল। এসব ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ে। ঋণ প্রদানের ছয় বছর পরও ৫০জন ঋণগ্রহিতাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শনাক্ত করতে পারেনি। ব্যাংক থেকে মাত্র ১০০গজ দূরে মহিপাল প্লাজায় ‘মেসার্স ওয়ানওয়ে টেলিকম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু এ নামে সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অপর দিকে যেসব ঋণ গ্রহিতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে তার বড় অংশই ঋণ পরিশোধ করেনি। গত ছয় বছরে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা। বর্তমানে সুদসহ প্রায় ৯ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে।

সোনালী ব্যাংক মহিপাল শাখা ব্যবস্থাপক মো. বদরুল মামুন জানান, ঋণ গ্রহিতারা ভুয়া নাম ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে বিভিন্ন কায়দায় নানা মাধ্যমে শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা গেলেও এখনও ৫০টি ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, তাঁর দায়িত্ব নেয়ার পর সোয়া চার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় করা হয়েছে এবং বাকি টাকা আদায়েও জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সোনালী ব্যাংক ফেনী মুখ্য কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আক্তারুজ্জামান বলেন, সবগুলি ঋণ গ্রহিতাকে খুঁজে বের করে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। আদালতে দায়ের করা কিছু মামলার রায় ব্যাংকের পক্ষে হয়েছে। এছাড়া আদালতের বাইরেও ঋণ আদায়ের মাধ্যমে মামলা নিস্পত্তি করা হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নোয়াখালী কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. তালেবুর রহমান জানান, দুদকের পক্ষ থেকে ৫৭টি মামলা করা হয়েছে। এরমধ্যে কিছু মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। কিছু মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *