ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথে ফের হুইসেল বাজবে !

সৌরভ পাটোয়ারী>>
দীর্ঘ একুশ বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে ফের চালু হচ্ছে ফেনী-বিলোনিয়া রেল যোগাযোগ। বহুল প্রতীক্ষিত এ রেলপথ চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। ২৭.৬ কিলোমিটার রেললাইনটি পুনঃস্থাপনের জন্য জরিপ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ৬০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত বাজেটের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভারত নিজ দেশের এক অংশ থেকে অপর অংশে সহজে পণ্য বহনের সুবিধা পাবে। ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার হবে ফেনী ও চট্টগ্রাম বন্দর। ভারতের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ এ রেলপথ পুনঃনির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় দু’দেশের সরকার।

ভারতীয় পণ্য বহনের পাশাপাশি বন্ধ থাকা ফেনী-বিলোনিয়া যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও সচল হবে বলে জানা গেছে। এজন্য এ রুটের পরিত্যাক্ত ৮টি স্টেশন পুনরায় নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে কবে নাগাদ রেলপথটি পুরোপুরি চালু হবে এ সম্পর্কে এখনই কিছু বলেননি দায়িত্বশীল মহল। এ রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে রেলের ত্রিমুখী যোগাযোগের কেন্দ্র ‘ফেনী জংশন’ পুনরায় জংশনের মর্যাদা পাবে। তবে দীর্ঘদিন রেলপথ বন্ধ থাকায় রেলের বেহাত হওয়া মূল্যবান সম্পত্তি, রেলের জমি চিহ্নিত এবং তা অবৈধ দখলদারদের থেকে মুক্ত করা এ মুহূর্তের একটি চ্যালেঞ্জ বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফেনী-বিলোনিয়া এক লেনের রেললাইন পুনঃস্থাপনের জন্য প্রাযুক্তিক-অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার কাজ দেয়া হয়েছে ভারতের হায়দরাবাদের আরভে এসোসিয়েটস আর্কিটেক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্টস কোম্পানিকে। বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়কে এক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছেন। ২০১৭ সালে রেলের যাবতীয় সম্পত্তি শনাক্ত, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণসহ প্রাথমিক কাজ শেষ করে জরিপ কার্য সম্পন্ন করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। তবে এখনো জরিপের প্রতিবেদন বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা হয়নি। প্রতিবেদন পেয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আদেশের ভিত্তিতে ফেনী জেলা প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করবে। এরপর শুরু হবে রেললাইন পুনঃনির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজ। এদিকে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়ায় রেললাইন নির্মাণ সমীক্ষার কাজ শেষ করেছে সে দেশের সরকার। ভারতের আগরতলা স্টেশন থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে ৪০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ হয়ে যায় যাত্রীবাহী ফেনী-বিলোনিয়া রেল যোগাযোগ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ফেনীর পর থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত ৮টি রেল স্টেশনÑ বন্ধুয়া, দৌলতপুর, আনন্দপুর, পীরবক্স মুন্সীর হাট, নতুন মুন্সীর হাট, ফুলগাজী, পরশুরাম ও বিলোনিয়া ভেঙ্গে চুরে ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। লুট হয়ে গেছে এসব স্টেশনের আসবাবপত্র, দরজা-জানালা। ২৭.৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রেললাইনের অনেক জায়গায় রেলপাত ও স্লিপার চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় রেলপথের অস্তিত আজ বিলীন। এসব ঘটনায় লাকসাম জিআরপি থানায় ৩০টির বেশি মামলা দায়ের করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। রেললাইনের উভয় পাশে ন্যূনতম ২০ ফুট করে ৪০ ফুট জায়গা রেলওয়ের মালিকানাধীন রয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের জায়গার পরিমাণের তারতম্য আছে। এসব ভূমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্র মতে, রেললাইনের আশপাশের শত শত একর জায়গা দখল করেছে প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা।

ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ চালু হওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে স্থানীয় অধিবাসী আবু ইউসুফ মিন্টু বলেন, বৃটিশ আমলে স্থাপিত, পরে বন্ধ হওয়া এ রেলপথ আবার চালু হলে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ভারতের আগরতলার সঙ্গে ফেনীর সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নির্মাণাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমেও ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

নতুন এ রেলপথ নির্মাণ প্রসঙ্গে পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, এটি চালু হলে দু’দেশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। এছাড়া স্থানীয় বেকার সমস্যা অনেকটা লাঘব হবে বলে আমি মনে করি।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় বলেছেন, ইতোমধ্যে জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিস্তারিত নকশার (ডিজাইন) পর জমি অধিগ্রহণ শুরু করা হবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে আদেশের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান জানান, ফেনী-বিলোনিয়া রেললাইনটি পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। রেলের যাবতীয় সম্পত্তি শনাক্তকরণ, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণসহ প্রাথমিক কাজগুলো এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। রেললাইন পুনঃস্থাপনে সমীক্ষা রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯২৯ সালে ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ চালু হয়েছিল। এ পথে সড়ক যোগাযোগ না-থাকায় এক সময় এ রেলপথ ছিল ফেনী, ফুলগাজী, পরশুরাম, বিলোনিয়ার সাধারণ মানুষের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। ১৯৭১ সালের পর রেলের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হওয়ায় গুরুত্ব কমে এ রেলপথের। লোকসানের কারণে ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *