সোনাগাজীর মুহুরী বাঁধে বিষটোপে পাখি নিধন

নিজস্ব প্রতিনিধি,
ফেনীর মুহুরী বাঁধ জুড়ে চলছে পরিযায়ী পাখি শিকার। অমানবিক আচরণে পরিযায়ী পাখিদের জীবন বিপন্ন। শীতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পাখিরা দলে দলে বাংলাদেশ ছাড়ছে। দেখার কেউ নেই।

লোভী পাখি শিকারিদের বিষটোপে মারা যাচ্ছে অনেক দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। ফলে ওই এলাকায় পরিযায়ী পাখি আসা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এলাকাটি এখন হয়ে উঠেছে পাখিদের মৃত্যুফাঁদ। পাখি বিশেজ্ঞদের মতে, এরআগে সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে হোয়াইট টেইলড সি ঈগল প্রজাতির ঈগল দেখা গিয়েছিল। এটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঘটনা।

স্থানীয়রা জানান, ফেনী নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠতে পারে পাখিদের অভরায়ণ্য। তার পরিবর্তে প্রশাসনের নিস্ক্রীয়তা কারনে শিকারিদের অভরায়ণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মুহুরী বাঁধ সংলগ্ন ফেনী নদীতে শিকারিরা জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে শয়ে শয়ে পাখি ধরে বস্তায় ভরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে।

তারা আরও জানান, জালে আটকে পড়া পাখিগুলো কোনও রকমে বেঁচে থাকলেও বিষটোপে বেশির ভাগ পাখি মারা যাচ্ছে। চামড়া ছাােনোর পর এসব মরা পাখি চলে যাচ্ছে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে। বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে।

স্থানীয় সাইফুল ইসলাম বলেন, মুহুরী বাঁধ সংলগ্ন পুরো এলাকা শীতের সময় ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে। অনেক সময় একহাত দূরেও দেখা যায় না। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় পাখি শিকারীরা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে তারা পাখি শিকারের জন্য জাল আর বিষটোপ ছড়িয়ে দেয়। সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁদে আটকে পড়া পাখিগুলো বস্তায় ভরে এলাকা ছেড়ে চলে যায় তারা। তিনি বলেন, ‘একবার এক পাখি শিকারী আমাদের হাতে ধরা পড়েছিল। পাখিগুলো কোথায় বিক্রি করে জানতে চাইলে জানান বেশির ভাগ পাখি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বিক্রি করেন তারা। সেখানকার
হোটেলগুলোতে পরিযায়ী পাখির মাংসের প্রচুর চাহিদা। দিনটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর। সারা দেশের মানুষ বিজয় দিবস পালন করছিল।
এদিন সরেজমিনে ফেনীর মুহুরী বাঁধ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কিছু পাখির পর্যবেক্ষক, সংরক্ষণকারী এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফারদের দেখা যায় ওই এলাকায়। তারা জানতে পারেন, মুহুরী বাঁধ এলাকায় বিরল প্রজাতির একটি ঈগল দেখা গেছে। ঈগলটির নাম ‘হোয়াইট টেইলড সি ঈগল বা সাদা লেজযুক্ত সমুদ্র ঈগল কেউ কেউ সাদা লেজযুক্ত ঈগল হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন।

বার্ড ফটোগ্রাফারদের অনেকেই বলেছেন, পাখিটি সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ তাদের সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করেছেন।

এ প্রতিবেদকের নিজস্ব বর্ণণায়- তখনও সূর্য ওঠেনি। আমরা কয়েকজন তিনটি দেশি নৌকায় ফেনী নদীর বিভিন্ন স্থান চষে বেড়াই। ঘন কচুরি পানার কারণে বেশিরভাগ জায়গায় যাওয়া যাচ্ছিল না। কোথাও কোমর পানি, কোথাও অথৈই। এ কারণে সব জায়গায় নৌকা নিয়ে যাওয়াও ছিল কষ্টকর।

হঠাৎ প্রায় এক কিলেমিটার দূরে দেখা গেল পানির মধ্যে একটি গাছে বড়সড় একটা পাখি বসে আছে। কিন্তু তার কাছে নৌকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অগত্যা নৌকা থেকে নেমে কাদা-পানি ভেঙে সেখানে যাওয়া হলো। একটু একটু করে এগুচ্ছিলাম, আর ছবি তুলছিলাম। সাধরণত, ডকুমেন্টেশনের জন্য এটাই করা হয়। যত কাছে যাচ্ছিলাম অতিকায় পাখিটি দেখে সবাই অবাক হচ্ছিলো।

মুহুরী বাঁধ এলাকায় পাখির সন্ধানে যাওয়ার আগে সবাই পাখিটি স¤পর্কে পাড়াশোনা করেছেন। দেখা পেলে তার স্বভাব স¤পর্কে জানা থাকলে সুবিধা হবে। স্বভাবজাতভাবে পাখিটি অকুতভয়। মানুষ দেখে যেখানে ভয় পেয়ে উড়ে যাওয়ার কথা, সেখানে বিশাল আকারের পাখিটি এক বিন্দু নড়াচড়াও করেনি। যেভাবে বসেছিল, নির্বিকারভাবে সেভাবেই বসে থাকলো। আমরা বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে তার ছবি তুলতে লাগলাম। একপর্যায়ে নাজিম আহমেদ নামের একজন ঈগলটির সঙ্গে সেলফিও তুললো।
এতো কষ্টের পরও যখন সে নড়াচড়া করছে না, তখন আমাদের মনে হলো পাখিটা হয়তো অসুস্থ।

এদিকে আমাদের ছবি তোলার মধ্যেই আরও একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। লোকজন বাড়ে, বাড়ে হৈ হললা। এ অবস্থায় পাখিটি বিরক্ত হতে পারে ভেবে আমরা ঐ জায়গা ছেড়ে চলে আসি। তবে তার আগে যতটা যায়গা ঘুরেছি, বেশিরভাগ স্থানেই হাঁস জাতীয় অসংখ্য মৃত পাখি ভাসতে দেখেছি।

প্রায় একঘণ্টা পর ঈগলের কাছে পৌঁছানো পরবর্তী দলটির সঙ্গে আবার দেখা হলো। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ঐ দলের একজনের কোলে পাখিটি চুপ চাপ বসে আছে। তারা জানান, তারাও পাখিটির ছবি তুলছিলেন। কয়েকটি ছবি তোলার পর হঠাৎ ঈগলটি গাছ থেকে নিচে পড়ে যায়। সেসময় তারা পাখিটি উদ্ধার করেন।

যার কোলে পাখিটি চুপচাপ বসেছিল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। তিনিও একজন বার্ড ফটোগ্রাফার। নাম সুলতান আহমেদ।

তিনি বলেন, দুঃসংবাদ! পাখিটি মারা গেছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডানার বিশালদেহী ঈগল টিকে। সম্ভবত বিষক্রিয়ায় মরেছে পাখিটি। এ আপসোস জীবনভর থেকেই যাবে।

তিনি আরও বলেন,পাখিটি উদ্ধারের পর যত দ্রæত সম্ভব যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। ১০-১৫ জায়গায় যোগাযোগ করে অবশেষে স্থানীয় বন ও পরিবেশ অফিসের কর্মকর্তার কাছে পাখিটিকে হস্তান্তর করি। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাখিটি মারা যায়।

সুলতান আহমেদ বলেন, পাখিটি আমরা দূর থেকে ঘণ্টাখানেক ধরে পর্যবেক্ষণ করি। যখন গাছের ডাল থেকে পড়ে যায়, তখন বুঝতে পারি পাখিটি অসুস্থ। সঙ্গে সঙ্গে রেপটর ধরার নিয়ম অনুযায়ী ঠোঁট এবং পা ঠিক করে ধরে নৌকায় তুলে রওনা দেই। কিছুক্ষণ ধরে রাখার পর দেখলাম পাখিটি পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। কোনো প্রকার আক্রমণ করারও মানসিকতা নেই। তখন ঠোঁট এবং পা ছেড়ে দেই। দেশের বিশিষ্ট ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফার ও পরিবেশ সংরক্ষণবিদ আদনান আজাদ আসিফ বলেন, মুহুরী বাঁধসহ দেশের অন্যান্য জলাশয়গুলোতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পরযায়ী পাখি আসে। তবে একশ্রেণির মানুষের অত্যাচারে এদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। যা পরিবেশের জন্য মারাত্বক। জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে বা বিষটোপের মাধ্যমে শীত মৌসুমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাখি শিকার করা হয়।
বিষটোপ দিয়ে শিকার করা পাখির মাংশ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। না জেনেই অনেকেই শিকার করা পাখির মাংশ খাচ্ছেন। এতে শিকারীরা উৎসাহিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে শিকার করা পাখি খাওয়া একটি অভিজাত বিষয় বলে মনে করা হয়।
ওই অঞ্চলের অনেক হোটেলে ঘোষণা দিয়ে পরিযায়ী পাখির মাংশ বিক্রি করতে দেখা গেছে। মূহুরী বাঁধ এলাকায় বিরল প্রজাতির যে পাখিটি মারা গেল, সেটিও অসাধু পাখি শিকারীদের বিষটোপের শিকার।

তিনি বলেন, শিকারীদের অত্যাচার বন্ধ করতে প্রশাসনকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখি আসা বন্ধ হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক স¤পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার এবিএম সরোয়ার আলম পাখিটির মৃত্যুর আলামত শুনে বলেন,বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
বাংলাদেশে এ প্রজাতির ঈগল অত্যন্ত বিরল। মৃত্যুর আলামত শুনে মনে হচ্ছে বিষক্রিয়ায় ঈগলটির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে পাখিটি বমি করেছিল। তাতে পাখির মাংশের টুকরা বেরিয়ে আসে। ধারণা করা হচ্ছে তার খাদ্য পাখিটিও বিষটোপে মারা গিয়েছিল। বিষাক্ত খাবার খেয়ে ঈগলটিও মারা গেছে হয়তো।

উল্লেখ্য, সাদা লেজযুক্ত ঈগল (হালিয়িয়েটাস আলবিসিল) একটি বৃহৎ প্রজাতির সমুদ্র ঈগল যা বিস্ততভাবে ইউরেশিয়া জুড়ে দেখা যায়। এটি পরিবারের আকপিট্রিডি (বা এপিপিট্রিডস) এর সদস্য। যার মধ্যে অন্যান্য ডুরানাল রেপ্টার যেমন হকস, কাইটস এবং হেরিয়ারগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হালিয়িয়েটাস প্রজাতির এগারোটির মধ্যে একটি, যাকে সাধারণত সমুদ্রের ঈগল বলা হয়। একে সাদা লেজযুক্ত সমুদ্র-ঈগল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। কখনও কখনও, এটি ইরান বা এরন হিসেবে পরিচিত। আবার ধূসর সমুদ্র ঈগল এবং ইউরেশিয়ান সমুদ্র ঈগল নামেও পরিচিত।

জাপানের হক্কাইডোতে গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের পূর্ব পশ্চিম পর্যন্ত এদের পর্যাপ্ত দেখা মেলে। তবে নানা কারণে এ প্রজাতির ঈগল বিলুপ্ত প্রায়। রাসায়নিক কীটনাশক, বিষ প্রয়োগ এবং বাসা বাঁধার ব্যর্থতার কারণে এরা বিলুপ্তির প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *