সোনাগাজীতে ভেড়া ও মহিষের খামার বিলুপ্তির পথে

নিজস্ব প্রতিনিধি:

ফেনীর সমুদ্র উপকুলীয় সোনাগাজী উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ভেড়া ও মহিষের খামার। আশির দশকে এখানে শতাধিক ভেড়া ও মহিষের খামার ছিল, সেখানে আজ হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি খামার আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, চারণভূমি সঙ্কট, জলদস্যুদের উৎপাত ও চাঁদাবাজির কারণে সাগরস্নাত উপকূলীয় অঞ্চলে ভেড়া ও মহিষের খামার বিলুপ্তির পথে।

সোনাগাজী উপজেলার দুই পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বড় ফেনী নদী ও ছোট ফেনী নদী। দুই নদীর তীর ও দেিণ সাগর মোহনায় আশি-এর দশকে ছোট বড় অসংখ্য চর জেগে ওঠে। জেগে ওঠা বিশাল আয়তনের উড়িরচর, চরখোন্দকার ও চর আব্দুল্লাহসহ কয়েকটি চরে হাজার হাজার একর চারণভূমি ছিল। এসব চরে খামারের মাধ্যমে ভেড়া ও মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করত চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ। চারণভূমিতে সারা দিন ঘাস খেয়ে নদীর পানিতে ভেসে থাকত মহিষের পাল।

সরেজমিনে ঘুরে ও খামারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভেড়া বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়। স্ত্রী ভেড়া এক বছর বয়স থেকে বাচ্চা দিতে শুরু করে। প্রতিবার এক থেকে তিনটি পর্যন্ত বাচ্চা দিয়ে থাকে। বাচ্চাদের জোয়ারের পানি ও শিয়াল-কুকুরের কবল থেকে রার জন্য নদীর তীরবর্তী চরে বাঁশের খুঁটির ওপরে মাচা তৈরি করে ভেড়ার জন্য টং ঘর বা খামার তৈরি করা হয়। দিনশেষে বা জোয়ার আসার আগে খামারিরা তাদের ওই খামারে ঢুকিয়ে রাখেন। অন্য দিকে মহিষও গরুর মতো বছরে একবার বাচ্চা দেয়। একটি মহিষ নয় থেকে দশ মাস পর্যন্ত দুধ দেয়। ভালো জাতের মহিষ পাঁচ-ছয় লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। খামারিরা প্রতিদিন এসব দুধ দোহন করে তরল দুধ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রী কের।

ভেড়া ও মহিষ পালনে বাড়তি কোনো ব্যয় না থাকায় আশির দশকে অধিকাংশ কৃষক ঝুঁকে পড়েন ভেড়া ও মহিষ পালনে। নব্বইর দশকের পর থেকে বিভিন্ন সময় বড় ফেনী নদী ও ছোট ফেনী নদীর অব্যাহত ভাঙন, ভূমিদস্যুদের ভূমি দখলে চারণভূমির সঙ্কট, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিভিন্ন সময় রোগাক্রান্তের কারণ ও জলদস্যুদের উৎপাতে খামারিরা ধীরে ধীরে ভেড়া ও মহিষ পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যেখানে একসময় শত শত ভেড়া ও মহিষের খামার ছিল সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি খামার ছাড়া বাকি গুলো বিলুপ্ত হয়েছে।

খামারিদের অভিযোগ, চারণভূমির সঙ্কট ও বিভিন্ন সময় জলদস্যুদের হামলা, চাঁদাবাজির কারণে ভেড়া ও মহিষ পালন সম্ভব হয়ে ওঠে না। জলদস্যুরা কিছু দিন পর পর এসে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে দেরি হলে রাতে এসে হামলা করে ট্রলার দিয়ে মহিষ ও ভেড়া লুট করে নিয়ে যায়। পরে তাদের দাবিকৃত চাঁদা দিয়ে মহিষ ও ভেড়া ফেরত আনতে হয়। বিষয়টি খামারিরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানালে চাঁদা ও নির্যাতনের পরিমাণ আরো বেড়ে যায় বলে জানান।

সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের চরখোন্দকার গ্রামের খামারি রফিক উদ্দিন জানান, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও জলদস্যুদের উৎপাত থেকে খামারিদের রা করতে পারলে সোনাগাজীতে আবারো আগের মতো সম্ভাবনাময় মহিষের খামার সৃষ্টি হতে পারে।

চরচান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মিলন জানান, ভূমিদস্যুদের হাত থেকে চারণভূমি রা এবং জলদস্যুদের চাঁদাবাজি ও আক্রমণ থেকে খামারিদের রা করতে পারলে এখনো উড়িরচর ও চর আব্দুল্লায় শত শত ভেড়া ও মহিষের খামার হতে পারে। তারা খামারিদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা তায়েরান ইকবাল জানান, বর্তমানে সোনাগাজীর চরাঞ্চলে ছোট বড় ২৫টি ভেড়ার খামার রয়েছে। এসব খামারে অন্তত সতের’শ ভেড়া রয়েছে। ছোট বড় ৩২টি মহিষের খামারে অন্তত সাড়ে তিন হাজার মহিষ রয়েছে। তিনি আরো জানান, বছরের বিভিন্ন সময় প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর থেকে খামারীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

সোনাগাজী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হুমায়ুন কবির জানান, সোনাগাজীর উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুদের দমনে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসন তৎপর থাকায় আগের তুলনায় এখন জলদস্যুদের উৎপাত কমেছে। ইতোমধ্যে অনেক জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

ছবির ক্যাপশন : চর আব্দুল্লাহ’র চরে ভেড়া ও মহিষের পাল ঘাস খাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *