সমস্যায় জর্জরিত ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় : ২৭ শিক্ষকের পদ শুণ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি>> বৃহত্তর নোয়খালীর ঐতিহ্যবাহী এবং ফেনী জেলা শহরে বালকদের একমাত্র সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ১৩১ বছরের পুরানো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

জানা গেছে, ১৮৮৬ সালে ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজাঝীর দিঘীর পূর্ব পাড়ে সদর হাসপাতাল সড়কের পাশে ১১.২২ একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠে ফেনী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় । ১৯৬৭ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়।

বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠার সময় স্কুলের ৩০ কক্ষবিশিষ্ট লাল রংয়ের মূল ভবনটি নির্মিত হয়। ভবনটি নির্মাণের এক শত ২১ বছর পর জরাজীর্ণ হওয়ায় ২০০৭ সালে গণপূর্ত বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও ছয় বছর যাবৎ ২০১৩ সাল পর্যন্ত শ্রেণি কক্ষের অভাবে চরম ঝুঁকি নিয়ে উক্ত ভবনে পাঠদান অব্যাহত ছিল। ২০১৩ সালে ঢাকায় রানা প্লাজা ধ্বংস হলে প্রশাসনের টনক নড়ে, ভবনটিতে শেণিশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে।

২০০৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের বেশ কয়েকটি সরকারি স্কুলের পাশাপাশি ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ডাবল শিফট চালু হয়। ডাবল শিফট চালু ও ছাত্রাধিক্যের কারণে আরো শিক্ষক পদায়ন প্রয়োজন হওয়ায় ২০১৩ সালে ২৬ শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়। অদ্যবধি স্কুলটিতে সে শিক্ষক আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে স্কুলটিতে ৫২জন শিক্ষকের মধ্যে আছেন ২৫ জন, ২৭ শিক্ষক পদই শূণ্য।

বর্তমানে ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রভাতী ও দিবা দুই শাখায় এক হাজার ৬০৮ ছাত্র অধ্যয়নরত। স্কুলের প্রশাসনিক এবং বিজ্ঞান ভবনে মাত্র ১১টি শ্রেণিকক্ষে গাদাগাধি করে এক হাজার ছয় শত ছাত্ররা পাঠদান চলছে। ন্যূনতম ২২টি শেণিকক্ষ প্রয়োজন। শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের সংকট অনেক বেশি।এতে পাঠদানে সীমাহীন ব্যাঘাত ঘটছে।

এইছাড়া বিদ্যালয়ের কøাশ চলে বিজ্ঞানাঘারে। ল্যাবরেটরী পরিপূর্ণ নয়, পুরাতন ভবনে ঝুঁকির মধ্যে স্বল্প পরিসরে ল্যাবের কার্যক্রম চলে। লাইব্রেরিটিও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অত্র বিদ্যালয়ে ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব নেই। ছাত্রাবাসে কিছু বই রাখা আছে, এটিই লাইব্রেরি। ছাত্রদের কমনরুম নেই, তাই বিরতি হলে ছাত্ররা এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে। বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠটি অত্যন্ত নিচু হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকে। ছাত্রদের খেলাধুলার কোন ব্যবস্থা নেই।

বিদ্যালয়ে প্রভাতি ও দিবা শাখার সহকারি প্রধান শিক্ষকদ্বয়ের জন্য কোন আলাদা অফিস রুম নেই। শ্রেণি শিক্ষদের জন্য রুম নেই। হিসাবরক্ষক রুম নেই। একমাত্র উচ্চমান সহকারি দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ। আটজন এমএলএসএস এর মধ্যে চারটি পদই শূণ্য।

ষষ্ট শ্রেণির ছাত্র সালমান এ মেহবুব শিহাব জানায়, শ্রেণিকক্ষে আমাদের খুব কষ্ট হয়, ঠাসঠাসি করে বসতে হয়। লাইব্রেরির অভাবে ভাল ও বিখ্যাত লেখকদের বই পড়তে পারিনা।

অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ইমরুল কায়েশ জানায়, বিদ্যালয়টি ফেনী জেলায় শীর্ষ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্ররা এই স্কুলে পড়তে এখনও আগ্রহী।

ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র নাফিউল ইসলাম নিহাল এর পিতা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, জেলা শহরে বালকদের একমাত্র সরকারি স্কুলটিকে ভবন এবং শিক্ষক সংকট থেকে উদ্ধার করা হোক।

প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম বলেন, শত প্রতিকুলতা অতিক্রম করে বিদ্যালয়টি বর্তমানে সর্বত্র সু-পরিচিত একটি নাম। চাহিদার অর্ধেক শিক্ষক দিয়ে অকান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চলছে। ফলাফলের দিক থেকে স্কুলটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে বরাবরই সুনাম ও আস্থা ধরে রেখেছে। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ফেনী জেলায় শ্রেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

ফেনী জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের আহবায়ক মো. গোলাম নবী বলেন, ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রত্যক্ষ করেছে বৃটিশ শাসন, পাক আমল এবং যার হৃদয়ে লেগে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন। ১৩০ বছরের ঐতিহাসিক এ প্রতিষ্ঠানটি জন্ম দিয়েছে জাতীর অনেক সূর্য সন্তান। তাই এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

ফেনী পৌরসভার ০২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর লুৎফর রহমান খোকন হাজারী বলেন, ঐতিহ্যবাহী জেলার শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যালয়ের সমস্যা সর্ম্পকে স্থানীয় সাংসদ নিজাম হাজারী মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে। আশা করি সহসা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে।

ফেনী জেলা প্রশাসক ও ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মনোজ কুমার রায় বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষা বান্ধব। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সমস্যা নিরসন এবং শিক্ষক নিয়োগে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখিত সমস্যাগুলো সমাধান হবে বলে।

ক্যাপসন : ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ভবন। বর্তমানে পরিত্যাক্ত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *