শিক্ষিকা থেকে মেহেরজান এখন ভিক্ষুক !

মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঞা>>
মুক্তিযুদ্ধে স্বামী ও ৬ শহীদ সন্তানের জননী মেহেরজান বিবি, এখন ভিক্ষা করে বেঁচে আছেন। সব হারিয়ে তার ঠাঁই হয়েছে এখন ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর আবাসন ও আশ্রায়ন প্রকল্পের ৩ নং ব্যারাকের ১১ নং কক্ষে।বয়সের ভারে ন্যুজ্ব ৮৮ বছর বয়স্কা অসহায় মেহেরজান বিবি জঠর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে ভিক্ষা করতে বের হন প্রতিদিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।
তাঁর দুঃখে ভারাক্রান্ত জীবন কাহিনী বলতে বলতে নিজে কাঁদেন এবং অন্যকেও কাঁদান। এই বয়সে চরম অসহায়ত্বের মাঝে দিন কাটছে তাঁর। পাশে কেউ নেই-আছে বেঁচে থাকা ও দিন যাপনের চরম আকুতি। মেহেরজান বিবি ১০ অক্টোবর ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইব্রাহীম উকিল, মা বিবি হনুফা।
পৈতৃক নিবাস চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুর হাটস্থ ২৬ নং দক্ষিণ তরপুর চন্ডী গ্রামে। তার তিন ভাই এবং তিন বোন। সোনাগাজী উপজেলার ৬নং চরছান্দিয়া ইউনিয়নের বড়ধলী হাজী বাড়ির মরহুম মমতাজ উদ্দিনের পুত্র সুবেদার এ টি এম সামসুদ্দিনের (পরে মেজর) সাথে মেহেরজান বিবির বিয়ে হয়।
পঞ্চাশের দশকে বড়ধলী গ্রাম নদী গর্ভে বিলিন হলে নিশ্বাস হয়ে তারা শহরে চলে যায়।ঢাকার মিরপুর ১ নাম্বারে জালাল দারগার বাড়িতে থাকতেন বলে জানা যায়।মেহেরজান বিবি’র ভাষ্য মতে, তাঁর ৮ পুত্র ও ২ মেয়ে ছিল। তাঁর ছয় পুত্র এবং স্বামী এ টি এম সামসুদ্দিন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহিদ হন।শহিদ পুত্রগণ হলেন ছায়েদুল হক (তৎসময়ে সিলেটে রিলিফ অফিসার পদে কর্মরত), দেলোয়ার হোসেন, বেলায়েত হোসেন, খোয়াজ নবী, নুরের জামান ও আবুল কালাম।
বাকী দুই পুত্র শাহ আলম ও শাহ জাহান, তাঁর খোঁজ-খবর নেন না এবং তাদের সন্ধানও তিনি জানেন না। দুই মেয়ে মরিয়ম বিবি ও হাসনা বিবি মারা গেছেন। মেহেরজান বিবি জানালেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী তাঁর স্বামী ও ৬ সন্তানকে হত্যা করে ক্ষ্যান্ত হয়নি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার জানতে পেরে মিরপুরে তাঁদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে তিনি ঢাকার মিরপুরে বাংলা মিডিয়াম হাই স্কুল (বর্তমানে মিরপুর বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়) এর শিক্ষিকা ছিলেন জানান।মেহেরজান বিবি জানান, স্বাধীনতার পর তাঁর দু:খ-কষ্টের কথা শেখ মনির দৈনিক বাংলা বানী পত্রিকায় ছাপা হলে তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর নজরে আসেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ও তাঁর এক পুত্রবধূ করফুলের নেছাকে ডেকে নিয়ে দুই হাজার টাকা করে অনুদান দেন এবং বঙ্গবন্ধু মেহেরজান বিবিকে পবিত্র হজ্ব পালন করান। স¦াধীনতা যুদ্ধের পর স্বামী সন্তানদেরর শহিদ হওয়ার খবরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনেও তাঁর পুরাপুরি মানসিক সুস্থতা ফিরে আসেনি। স্বজন-পরিজন সব হারিয়ে চরম অসহায়ত্বে পড়ে ভিক্ষাভিত্তির পথ বেছে নেন তিনি।
২০০৯ সালে ফেনী রেল স্টেশনে ভিক্ষা করতে দেখে জনৈক জিআরপি পুলিশ তাঁকে ফেনী জেলা প্রশাসনে পাঠায়। তখন জেলা প্রশাসনের উদ্দ্যোগে তাঁকে পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হয় ধর্মপুর আবাসন প্রকল্পে। সেই থেকে তিনি এখানে বসবাস করছেন।
সোনাগাজী উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ নাসির উদ্দিন জানান, মেহেরজান বিবি সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখী হয়েছে, তবে কোন কাজ হয়নি। তাঁর স্বামী-সন্তান যে শহিদ হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই্। আমি গেজেটে তাঁর নামও দেখেছি।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ফেনী জেলা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার আবদুর রহমান মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন থেকে মেহেরজান বিবির সাথে আমার সর্ম্পক। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন এবং ছেলে ডাকেন।
ফেনীর জেলা প্রসাশক মনোজ কুমার রায় বলেন, আশ্রায়ন প্রকল্পে সুবিধা ভোগীর একজন মেহেরজান। আমরা তার সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে পেরেছি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছয় সন্তান ও স্বামী হারিয়েছেন। এই ছাড়া তাঁর অনেক করুন কাহিনী শুনেছি। তাঁর জন্য সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *