রুদ্ধদ্বার বৈঠক

আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাব্য রূপরেখা ও প্রস্তাব নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে বিএনপি। শুক্রবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সচিবসহ প্রায় ১২-১৪ জন অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, গুলশানের বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমদু চৌধুরী ও সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের সময় দলের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি)-এর ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, সহায়ক সরকার গঠন ও সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়কে সামনে আনছে বিএনপি। তবে প্রস্তাব উত্থাপনের আগে গোপনীয়তা রক্ষা করছে দলটি।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার রাত পৌনে বারোটার দিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো এ বিষয়টি ডিসক্লোজ করব না। এটা আলোচনা করা যাবে না। এটা ইন্টারনাল মিটিং। প্রাইভেট মিটিং। ইসি নিয়ে তো কয়েকবারই মিটিং হয়েছে।’

জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের জন্য দলের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রস্তাবের রূপরেখা তৈরির ড্রাফটিং করেছেন কয়েকজন। এর মধ্যে অন্যতম সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহ। শুক্রবারের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচনার বর্ণনাসহ পুরো খসড়াটি পাঠানো হবে লন্ডনে অবস্থানরত দলের প্রধান খালেদা জিয়ার কাছে। সেখানে অবস্থান করা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ খালেদা জিয়া বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন  বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে যেদিন যাব, সেদিন আমরা উত্থাপন করব। এটা আগে বলার কিছু নেই। আমাদের নেত্রী লন্ডনে, আমরা কিছু চিন্তাভাবনা করেছি, সেটা তাকে পাঠাব। এরপর আমরা বুঝব যে, কি বলব, না বলব।’

যা থাকতে পারে বিএনপির প্রস্তাবে

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের সময় দলটির প্রস্তাবের রূপরেখায় মূল ফোকাস থাকবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন কার্যক্রমের ওপর। সাংবিধানিকভাবে প্রাপ্ত ইসি’র ক্ষমতা যেন পুরোপুরি ব্যবহার করার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেবে বিএনপি।

সূত্রের আরও দাবি, বিএনপির প্রস্তাবের একটি মৌলিক জায়গা থাকবে গত বছরের ১৮ নভেম্বর হোটেল ওয়েস্টিনে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ধারাগুলো। এর বাইরে নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় ক্যামেরা স্থাপন, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান, নির্বাচনী এলাকার পুনঃনির্ধারণ এবং শুনানি গ্রহণের বিষয়টি রয়েছে।

এছাড়া নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার প্রাক্কালে নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, যেমন: স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকার প্রস্তাব রাখতে পারে বিএনপি।

নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন বাহিনীর ক্ষমতা ও নির্বাচনকালীন পর্যবেক্ষক নিয়োগসহ নির্বাচনী বিষয়ে প্রস্তাব করবে দলটি। এছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে সহায়ক সরকার গঠন ও নির্বাচনের আগেই দশম সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব রাখতে পারে বিএনপি।

উল্লেখ্য, এর আগে খালেদা জিয়া ইসি বিষয়ক প্রস্তাবে উল্লেখ করেছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনই যথেষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহযোগিতা প্রদান এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনেরবিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয়, তাই আমাদের প্রস্তাবে থাকবে। নির্বাচন ব্যবস্থা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেই ক্ষেত্রগুলোও আমাদের প্রস্তাবে থাকবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট মহল যা ভাবছেন, তাই থাকবে। বাংলাদেশের নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণগুলো সবাই জানে। আমাদের প্রস্তাবে এর থেকে উত্তরণের বিষয়গুলো তুলে ধরেছি আমরা। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।’

খালেদা জিয়ার ইসি বিষয়ক প্রস্তাব এক্ষেত্রে কতখানি প্রভাব ফেলবে, এমন প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘ওইটা পুরো ইসির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ছিল। আর সংলাপের বিষয়টা হচ্ছে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে ওই প্রস্তাবের কিছু অংশ তো থাকবেই, তবে ফোকাস-পয়েন্ট থাকবে আগামী নির্বাচনই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *