রাজাকার-রা আমাকে জোর করে কোরআন শপথের অপচেষ্টা করে>>প্রফেসর তায়বুল হক

নিজস্ব প্রতিনিধি>

এক খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক প্রফেসর তায়বুল হক বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে সে দিন রাজাকাররা আমাকে পবিত্র কোরআন শপথের অপচেষ্টা চালায়।
একান্ত সাতকার গ্রহণ করেন ফেনীর তালাশের নির্বাহী সম্পাদক সৌরভ পাটোয়ারী সাথে ছিলেন এস এম সায়েম।

এ সময় তিনি তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা জীবনের স্মৃতি কথা তুলে ধরেন।
মহান শিকতার পাশাপাশি স্বাধীনতা যুদ্ধেও ছিল প্রফেসর তায়বুল হকের ছিল বিশেষ অবদান।তিনি ছিলেন সফল মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ।

এদেশের জন্য কাজ করেছেন বারং বার। তিনি জানান, ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলাম। তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি ছাত্রলীগের সভাপতি। পাক হানাদারদের জোর জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে থাকে এদেশের মানুষ। শুরুহলো ১৯৭১ সাল। প্রতিবাদী মানুষগুলা একত্রিত হতে থাকে। ২৬ মার্চ ঘোষনা আসে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার। আমিও আমার সাথে যারা ছাত্রলীগ করতেন তারা যোগ দেন মুজিব বাহিনীতে। সেই মুজিব বাহিনীর সদস্য হয়ে ১৯৭১ সালের মে মাসে আমি ভারতের সোত্বাখোলা এলাকায় ১৫ দিনের যুদ্ধ প্রশিণ গ্রহণ করে দেশে আসি প্রথমে কুমিল্লার ব্যতিয়ারায়। সাথে ছিলেন ফেনীর রামপুরের খাজা আহম্মদ, কর্নেল জাফর ইমাম, জয়নাল আবেদীন ভিপি জয়নালসহ আরো অনেকে।

মূলত: ফেনীর রাজা খাজা আহম্মদের সাথে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। ১ ও ২ নং সেক্টরে দায়িত্বরত মুজিব বাহীনি, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক হিসেবে বুদ্ধিদাতা, পরামর্শক ও দায়িত্ববন্টনের কাজ করি। এরপর আমি চলে আসি আমার গ্রাম দাগনভূঞায়ার দুধমুখায়। আসা যাওয়া ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প কোরাইশমুন্সিতে। সেখানে মাহফুজ কমান্ডার, ডেপিুটি কমান্ডার নুর নবী, সালামত উল্যাহ, রুহুল আমিন, শফি উল্যাহ, ফেনীর ফতেহপুরে শাহজাহান জামশেদ ও গুদাম কোয়াটার এলাকার এ্যাডভোকেট মুসা মিয়া ছিলেন মুজিব বাহীনির নেতাকর্মীদের দেখভালের দায়িত্বে নিয়েজিত।

সেপ্টেম্বরে হঠাৎ রাজাকার চৌধুরী মাঈন উদ্দিন (ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক) ও তার ভাই আতিক চৌধুরী আমিও আমার ভাই ফজলুল হককে এরেস্ট করে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত আটকে রাখে। পরে আমাদেরকে ফেনীর রাজাকার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। শিাগত যোগ্যতা বেশি থাকায় তারা আমার প্রতি নমনীয় আচরণ করে। তবে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা আমাকে ফেনীর পুরাতন রেজিষ্ট্রি অফিস সংলগ্ন মসজিদে নিয়ে যায়। সেখানে পবিত্র কোরআন শরিফের উপর হাত রেখে মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে শপথের অপচেষ্টা চালায়। সে দিন চাপে থাকলেও অন্তরে ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরে শপথ। মুচলেকা নিয়ে রাজাকাররা আমাকে পাঠিয়ে দেয় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। সেখানে দুইদিন থাকার পর আবার দেশের টানে চলে যাই ভারত।

নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাতের বেলায় ভারত বাংলাদেশের আসা-যাওয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পগুলো দেখভাল করতাম। নভেম্বরের শেষ সাপ্তাহে আমার গ্রাম দুধমুখার চন্ডিপুরে ক্যাম্প করি। এ সময় ভারতীয় সেনাদের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতর হতে থাকে। পিছু হটতে থাকে রাজাকাররা। এক পর্যায় ৫ ডিসেম্বর ভোরে ফেনী হানাদার মুক্ত হয়। চারদিক থেকে আনন্দ মিছিল আসতে থাকে। এসময় ফেনীর সিএনসি রাজাকার কমেন্ডার ইলিয়াছকে দাগনভূঞার আতাতুর্ক স্কুলের ৯ নং কে বোরকা পরা অবস্থায় ধরে বেদম ধোলাই দেয়া হয়। পরে তাকে ফেনীর আনার পথে মৃত্যু হয়। তার মৃতদেহ ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ল্যাম্প পোস্টের সাথে হাত মেলে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

উল্লেখ্য, প্রফেসর তায়বুল হক ৬ আগস্ট ১৯৪৯ সালে ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার ৫নং ইয়াকুবপুর ইউনিয়নে বরইয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী মমতাজ উদ্দিন, মাতা মরহুমা হাবিবের নেছা। তিনি ৬ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তিনি ১৯৫৮ সালে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। দুধমুখা জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি এবং দাগনভূঞা আতার্তুক স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুলে ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাশ করেন। মেধাবী তায়েবুল হক চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। নানান সমস্যার কারণে তিনি ফেনী কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে তিনি এইচএসসি এবং ১৯৬৮ সালে ফেনী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। শিকতার মাধ্যমে প্রফেসর তায়বুল তার পেশাজীবনের সূচনা করেন। ৯ আগস্ট ১৯৭২ ঐতিহ্যবাহী ফেনী কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান।

পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজে বদলি হন। ২০০১ সালে ওই কলেজে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে প্রধান পদে যোগদান করেন। একই পদে ২০০২ সালে ফেনী কলেজে বদলি হন, ২০০৪ সালে ফেনী কলেজে উপাধ্য পদে যোগদান করেন। খ্যাতিমান এ শিক তায়বুল হক ২০০৪ সালে প্রফেসর পদে পদোন্নতি পান। অতপর তিনি নোয়াখালী সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। প্রফেসর তায়বুল হক ২০০৫ সালে রামগঞ্জ সরকারি কলেজে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন।

একই বছর তিনি ফেনী কলেজে অধ্য পদে যোগদান করেন এবং ২০০৭ সালে তিনি নোয়াখালী কলেজের অধ্য থেকে অবসরে যান। কৃতিমান এ শিাবিদ মুক্তিযোদ্ধা ২০০৮ সালে দাগনভূঞার ঐতিহ্যবাহি ইকবাল মেমোরিয়াল ডিগ্রী কলেজে যোগদান করেন। অত্যন্ত সফল ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে তিনি উক্ত কলেজ থেকে ৩১ অক্টোবর ২০১৩ অব্যহতি নেন। ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর খ্যাতিমান প্রথিতযশা এ শিাবিদ ফেনী ইউনির্ভাসিটির ট্রেজারার পদে যোগদান করেন এবং উক্ত পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন।

প্রফেসর তায়বুল হক শিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন শিা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত রয়েছেন। ব্যক্তি জীবনে ২ পুত্র, ১ কন্যা সন্তানের জনক। প্রথম পুত্র বর্তমানে একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে কর্মরত এবং অপর পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাশ করে বর্তমানে একটি বিদেশী ফার্মে কর্মরত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *