যেভাবে আমি ফেনীর হয়ে গেলাম…

সোহেল রানা…..

২০১৬ সালের মার্চ মাসে আমি এক অজানা অচেনা ফেনীতে পা রেখেছিলাম। ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট আমি খুব চেনা আর খুব আপন এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। দুটি অপরিস্ফুট চোখ, দুটি দুর্বল হাত; একটি শোষিত স্বপ্ন আর এক অসহায় আত্মসমর্পণের আশঙ্কা নিয়ে এই শহরে আমি এসেছিলাম। আমি যে খুব ছোট, আমার স্বপ্ন যে ইঁচড়ে পাকা; আমাদের নজরুল যে মরে গেছে- এগুলো আমি জানতাম। এই শহরটি যে একটি পথভ্রষ্ট নক্ষত্র হতে খসে পড়েছে সেটিও সম্ভবত আমি জানতাম।

এতসব জানাজানির পরও, আটকে পড়া ভবিষ্যতের নিশ্চিত রোডম্যাপ দেখেও আমি স্বপ্নকে শোষণমুক্ত করার স্পর্ধায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। আমি এক অনিরাপদ ঢাল আর বেঁধে রাখা তলোয়ার নিয়ে এই শহরের পথে প্রান্তরে, ঘরে বাইরে, হাটে বাজারে নিয়ম করে প্রতিদিন ঘুরে বেড়িয়েছি আর এক সবুজ পৃথিবীর লিফলেট বিতরণ করেছি। প্রতিদিনই কিছু না ঘটেছে; প্রতিদিনই ফেনী আর আমি পরস্পর পরস্পরকে আবিষ্কার করেছি নতুনভাবে। এক একটি দিন যেন এক একটি এডভেঞ্চার সিরিজের নতুন সংস্করণ।

শায়ন্তীর প্রবাসী বাবা তার মেয়ের গলি দিয়ে নিরাপদে স্কুলে যাবার প্রার্থনায় টেলিফোনে কেঁদেছে। বিধান বাবু তার দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তির সবটুকু আর্তনাদ কয়েকটি আবেদনপত্রে জমা করে নগরপিতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। নাছিমা বেগম সপ্তাহে একদিন মাংস কিনে ঠকেছে। সাইফ এক প্রবঞ্চক রেস্টুরেন্টে দেশি মুরগির দাম দিয়ে ব্রয়লার খেয়েছে। গ্রাম গঞ্জের শিশুরা জেনেশুনে বিষ পান করছে ব্যবসায়ীদের পকেটের স্বার্থে। সীমান্তজুড়ে সর্বনাশ আর ভবিষ্যৎ নিধনের নীল নকশা গড়ে উঠেছে। একটা গোটা শহর, সমগ্র জাতি ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। রহমান সাহেবের রক্তের পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এরকম অসংখ্য ফিসফাস আর চিৎকারে এই শহর ভারি হয়ে উঠছে। এই শহরে অনেক ব্যবসায়ী মুনাফার কাছে বিবেক বন্ধক রেখেছে। শহর আর সীমান্ত নাকি মাদক ব্যবসায়ীরা ইজারা নিয়েছেন। এই শহরের প্রেস ক্লাবে তালা ঝুলেছে। বিচার এই শহরে শক্তিশালীদের ব্যক্তিগত অধিকারে পরিণত হয়েছে। বিচারের চারপাশে শক্ত প্রাচীর ; প্রাচীরের চারপাশে হায়েনা আর শকুনের দল পাহারা দেয়।

এভাবেই আমি প্রতিদিন দেখছিলাম এই শহরকে; বোধহয় পুরো বাংলাদেশকেই। শায়ন্তীর বাবাকে আমি কথা দিয়েছিলাম; বিধান বাবুর পরহস্তগত সম্পত্তি আমি দেখতে গিয়েছিলাম, সীমান্ত আমি ঘুরে এসেছি, ব্যবসায়ীদের আমি ন্যায়ের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম। বিচারকে আমি শক্তিশালীদের হাত থেকে বের করে এনে শায়ন্তী, বিধান বাবু, সাইফ বা অজানা অচেনা গ্রাম্য কিশোরদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম। এইসব অশ্রু, আকুতি আর আর্তনাদ আমি একটি ছোট হৃদয়ে ধারণ করার চেষ্টা করতাম। আমার দুর্বল দুটি হাতে শায়ন্তী, বিধান, নাছিমা আর ফেনীর এক অদম্য তরুণ সমাজ চোখ বন্ধ করে হাত রাখছিল। আমরা একটি প্রতিরোধের মিছিল নিয়ে শক্ত দেয়ালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা হায়েনা আর শকুনদের সাথে এক অসম যুদ্ধে ছিলাম। আমার শোষিত স্বপ্নের চিৎকার আমাদের সকলের স্বপ্নে পরিণত হচ্ছিল; দ্রোহের মশাল হয়ে অন্ধকারে দাউ দাউ করে জ্বলছিল। শ্রীকৃষ্ণ এক ধরণের ধর্ম অধর্মের যুদ্ধের কথা বলতেন; মোহাম্মদ (সাঃ) এক ধরণের সাম্য ও ন্যায় বিচারের ইহকাল পরকালের কথা বলতেন, রবার্ট ফ্রস্ট এক নির্জন রাস্তার পথিকদের নিয়ে কবিতা লিখে ফেলতেন, মহাত্মা গান্ধী শোষিতের অসহায়ত্বের অভিমানে না খেয়ে রাস্তায় বসে যেতেন; মার্টিন লুথার একটি নিরপেক্ষ কলমের ছোট নিবে বিরাট এক স্বপ্নকে ঢুকিয়ে ফেলতেন। এতকিছুর পরও পৃথিবী খুব আশ্চর্যজনকভাবেই উনাদের পৃথিবী হয়নি; উনারা ব্যতিক্রম হয়েছেন আর আমরা প্রদীপের নিচে বসবাস শুরু করেছি। আমরা এক ছোট শহরে এক বড় স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা সচেতনভাবে করে ফেলেছিলাম।

আমি প্রায় সবখানেই ছিলাম। আলোচনায় ও সমালোচনায়। সুশীলেরা সুবিধার রেখা বরাবর থেমে যাচ্ছিল। নগরপিতারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছিল। আমার দুর্বল হাত ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছিল। এইসব শোষিত, পরাজিত, প্রতারিত আর এদের অন্ধ সমর্থকেরা আমাকে খুব টানত; অনেক বেশি কাঁদাত।

সময় ঠেলাগাড়ি থেকে রকেটের পিঠে সওয়ার হয়েছিল। রাতের পশ্চিমাকাশে শুকতারার প্রতিদিনে অভিমান জমে কখন পাহাড় হয়ে গিয়েছিল টের পাইনি। অভিমানী শুকতারা ভুলে সময় দড়ির মত টেনে আমি বিরবির করে রবার্ট ফ্রস্ট পড়ছিলাম। ঘুমগুলো জমে চোখের কোণে ঠাঁই করে নিয়েছিল। আমরা এক দুরন্ত দৌড়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম, আমরা জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমরা একটা যুদ্ধের মধ্যেই ছিলাম এবং আমরা একটা যুদ্ধের মধ্যেই থাকব!

অতঃপর আমি থামছি!

কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই থামছি না। অসহায় আত্মসমর্পণের কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করিনি। আমি, তুমি ও সে মিলে ন্যায়ের পতাকা উঁচু করে মেলে ধরেছি। আমরা শুধু সোহেল রানা আর ফাহিমা নাসরিনদের জন্য একটি সবুজ পৃথিবী চাই নি। আমরা ফিয়নার জন্য একটি পৃথিবী গড়ে তোলার কথা বলেছি। একটা সময় দিন বদল আমার কাছে খুব ক্যালেন্ডারীয় মনে হত; সাদার সাথে কালোর যুদ্ধকে আমার সাদার জন্য খুব পরাজিত মনে হত।

এখন আমি দিন বদলে বিশ্বাস করি; কারণ আমি দিনকে বদলে যেতে দেখেছি; কালোকে সাদার পায়ে আছড়ে পড়তে দেখেছি। ন্যায়ের পক্ষে, সাদার পক্ষে, বিচারের পক্ষে যে প্রকান্ড তোলপাড় ফেনীর মানুষ আমাকে শিখিয়েছে সেটি নজিরবিহীন। বিদায়ের সময় একটা স্বীকারোক্তি দিয়েই ফেলি ” আরো কত কিছুই না করা যেত। কত কাজ বাকি রয়ে গেল!”

ফেনীর মাটি ও মানুষের কাছে কতই না শিখেছি আমি। যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটি অর্জনের যোগ্যতা অর্জন করতে হলে আমাকে শত কোটি বছর বেঁচে থাকতে হবে। কোন এক ভুয়া ডাক্তার শাস্তি পাবার আগে আমার কানে কানে বলেছিলেন তিনি তার সন্তানের নাম সোহেল রানা রেখেছিলেন। এত ভালোবাসা; এত অনুরণন আমি কোথায় রাখি। এই শহর আমাকে এতকিছু দিয়ে দিল একবার ভাবলও না!! বিদায় বেলায় কি সীমাহীন ঋণ আমি নিয়ে গেলাম তার জন্য কোন ভাষা হয় না! এইসব ভালোবাসা বাকি জীবনে আমাকে আর অসুখী হতে দিল না!

মাঝে মাঝে এসে ফেনীকে দেখে যাব; দ্রোহের মশালের ধারে বসে শুকতারা দেখব।

এই শহরকে এক জীবনে আর ভুলতে পারলাম না…

দ্রষ্টব্যঃ ২৩ আগস্ট রাতে আমি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ( টুইন সিটিস ক্যাম্পাস) পাবলিক পলিসিতে ২ বছরের জন্য মাস্টার্স করতে যাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *