মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঃ

শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,২১শে ফেব্রুয়ারী,২০২১,ঢাকাঃ
কুমড়ো ফুলে-ফুলে; নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায় ভরে গ্যাছে গাছটা
আর, আমি; ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি,
খোকা তুই কবে আসবি। কবে ছুটি?”
চিঠিটা তার পকেটে ছিলো, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।
“মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে ;
তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না।
বলো মা, তাই কি হয়?
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র লেখা ‘কোন এক মাকে’ পড়া অনেকেরই। আমার ছোট বেলায় যখনই এই কবিতা পড়েছি, অমর একুশের প্রেক্ষাপটের একটা ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠতো।অমর একুশ ১৯৫২, আমার ভাইয়েরা, ভাষা শহীদগণ আমাদের মায়ের ভাষায় আমাদের চেতনা বা অস্থিত্ব জানান দেয়ার জন্যে অকাতরে প্রাণ দিয়ে গেছেন যেদিন। কিভাবে পেলাম আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার, ইতিহাস থেকে চোখ বুলিয়ে নেই আজ।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়, কিন্তু পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক ও ভাষাগত দিক থেকে পার্থক্য ছিল প্রচুর। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, যা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ (যারা সংখ্যার বিচারে সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল) এ সিদ্ধান্তকে মোটেই মেনে নিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন জানান যে পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তই মেনে নেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলে আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিটিং-মিছিল ইত্যাদি বেআইনি ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে। এই ঘটনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার গণ আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন ও মানুষের ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে।
একুশের প্রথম গানটি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী; আর এটির গীতিকার: আবদুল গাফফার চৌধুর, সুরকার: আলতাফ মাহমুদ।

এতো জানলেন ভাষা দিবসের ইতিহাস,এখনকার প্রেক্ষাপটটা কি জানতে চান?ভাষা রক্ষায় যারা জীবন দিয়েছে তাদের স্মরণ করার পাশাপাশি আমরা যদি সেসময়ের(১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির সময়কার) সহজ সরল জীবন আদর্শ বোধ রপ্ত করে নীতি শিক্ষা বাংগালী জীবনে প্রবাহিত করতে পারতাম তাহলেই তাদের(ভাষা শহীদদের) আত্মা শান্তি পেতো।আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা দিন দিন আমাদের জীবনাচার সমাজে রাস্ট্রে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছি।আমরা মুখে পোশাকে সব পালন করি নির্দিষ্ট দিনে কিন্তু সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতার চরম শিখরে আরোহন করেছি।
আশা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
একদিন ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষা জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হবে।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাংলা ভাষাকে নিয়ে যাক অনন্য উচ্চতায়।
ভাষা শহীদ সহ সকল গনতান্ত্রীক আন্দোলনের জীবন দানকারীদের শ্রদ্ধা জানাই আজকের এই দিনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *