মানবতা ভেসে যায় নাফ নদীর জলে

২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া আয়লান কুর্দির দেহ ভেসে আসে তুরস্কের উপকূলে। সৈকতের বালুকাবেলায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আয়লান হয়ে ওঠে বিশ্বমিডিয়ার চাঞ্চল্যকর খবর। ইউরোপ শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে সিরিয়া সংকটে পড়া হাজারো মানুষকে। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে নাফ নদীতে ভেসে যাওয়া প্রাণহীন শিশুরা বিশ্বমিডিয়ার নজর কাড়ে না!

এ বছর জানুয়ারিতেই নাফ নদীর তীরে ভেসে আসে ১৬ মাসের রোহিঙ্গা শিশু মহম্মদ শোহায়েতের দেহ। মিয়ানমারে হিংসার পরিপ্রেক্ষিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের খোঁজে আসছিল ওই শিশুর পরিবার। সে সময় তার বাবা জাফর আলম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিলেন, এই ছবি দেখার পর মনে হলো আমার মরে যাওয়া উচিত। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আর কোনো মানেই নেই। আমাদের মানবিক মন কত আয়লান কুর্দি বা শোহায়েতের ভার বইতে পারে?

মানুষের আবাসভূমি আরাকান এখন বিভীষিকায় পরিপূর্ণ। দমনপীড়নের কারণে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসছে। সামগ্রিকভাবেই অন্ধকারে ছেয়ে গেছে মিয়ানমার, সেখানে জীবনবোধ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবনহরণের জিঘাংসায় জর্জরিত তাদের রাজধর্ম। ২০০৭ সালে ‘স্যাফ্রোন রেভল্যুশন’ বা ‘গেরুয়া বিপ্লব’-এর পর পুরো মিয়ানমার এখন বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের চারণভূমি। সেখানে হিন্দু, ক্রিস্টান বা মুসলমানের নিঃশ্বাস ফেলার কোনো জো নেই। তবে মুসলমান অধ্যুষিত আরাকান বা রাখাইন রাজ্যকে সবচেয়ে বড় নরক বানিয়ে ফেলেছে বার্মিজ সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা। রোহিঙ্গা মুসলমানদের গুলি করে বা পুড়িয়ে মারছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ওদের দাবি, রোহিঙ্গারা নাকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে অনুপ্রবেশকারী বাঙালি। তারা কথাও বলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলা ভাষায়!

মিয়ানমারের অঙ্গরাজ্য আরাকান বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এবং অতি প্রাচীনকাল থেকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের আগে অধিকাংশ আরাকানি ছিল প্রকৃতি পূজক। যদিও কালের পরিক্রমায় এখন বেশিরভাগই মুসলিম। একসময় সম্রাট আওরঙ্গজেব ও সুজাদের আমলে মোগল সম্রাটদের অধীনেই ছিল আরাকান। আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়েছে মধ্যযুগে। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলমান কবি সৈয়দ আলাওল, দৌলত কাজী প্রমুখ আরাকান রাজসভারই কবি।

বাঙালির সঙ্গে আরাকানিদের হাজার বছরের এমন সম্পর্কের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে শুধু বাংলাভাষী ও ধর্মমতে মুসলমান হওয়ার কারণে লাখো রোহিঙ্গাকে উদ্বাস্তু করে দিচ্ছে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা। বার্মিজরা এখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বই স্বীকার করছে না। এমনকি বর্তমান মিয়ানমারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তথাকথিত গণতন্ত্র আন্দোলনের নেত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি পর্যন্ত বলে দিয়েছেন, রোহিঙ্গারা বাঙালি দুষ্কৃতকারী! সুতরাং তাদের জন্য কোনো মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার খাটে না। আর এভাবে নিজের জন্মভূমিতে নাগরিকত্বহীন হয়ে বেঁচে থাকবার কী যে যাতনা, তা বুঝে চলেছে রোহিঙ্গারা।

আমরা কয়েক দশক ধরে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি মেনে নিয়েও মানবিক দিক বিবেচনায় প্রতিবেশীর দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে অন্তত চার-পাঁচ লাখ আরাকানি মানুষকে বাংলাদেশের ভূমিতে জায়গা দিয়েছি। ওরা অভাবের কারণে দেশের নানা অপরাধপ্রবণগোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলাচ্ছে, তা-ও সামলে চলছি। কিন্তু আর কত? বার্মিজ সেনাবাহিনীর অবর্ণনীয় অত্যাচারে এখনো পিপীলিকার সারির মতো অসহায় মানুষ আমাদের সীমান্তে ভিড় করছে। মানুষ হয়ে মানুষের এমন দুর্বিপাক কতটা সওয়া যায়?

বিশ্বমোড়লদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে না রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি। অথচ বিশ্ব ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে সবচেয়ে নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের শক্তিধর দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীন চাইলে স্বল্প সময়েই আরাকান সংকটের সমাধান করতে পারে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাজার ঠিক রাখতে মানবাধিকার রক্ষায় এতটুকু মাথাব্যথা নেই বললেই চলে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা সমস্যা তদন্তে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন মিয়ানমারে আসে। গত বৃহস্পতিবার কফি আনান কমিশন তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করেছে। কফি আনানের প্রতিবেদনে ৮৮টি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং তাদের চলাচলে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার। দুঃখজনক হলো, প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই কয়েকশ রোহিঙ্গার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বার্মিজ বাহিনী। সহিংস বর্বর সেনাবাহিনী প্রমাণ করতে চাইছে, তোমাদের তদন্ত কমিশনের সুপারিশ আমরা থোরাই কেয়ার করি!

পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে যিনি গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও বিশুদ্ধ শান্তিকামী, সেই অং সান সু চি এখন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের অবতার। মহামতি বুদ্ধের নির্বাণ বা মানুষের দুঃখ ঘোচানো তার আরাধ্য নয়, তার ধ্যানজ্ঞান এখন সেনাতোষণে ক্ষমতা পাকাপোক্তকরণ। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের পোশাক পরে সু চি আসলে বর্বর মিলিটারি জায়ান্টদের দুর্বল ক্রীড়নকমাত্র।

আর এ ধরনের মানবতাবিরোধী দুর্বলচিত্তের শাসক বা শোষকের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)’। আরসার মুখপাত্র আবদুল্লাহ হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারা মিয়ানমারের মধ্য থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন। আবদুল্লাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আরসাকে ‘সন্ত্রাসবাদী ভাবা’ কিংবা ‘মিয়ানমার সরকারের ফাঁদে পড়া’ থেকে সতর্ক থাকুন। যদিও মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে আরসাকে ‘বাঙালি সন্ত্রাসবাদী’ বলে অভিযোগ করে আসছে। ক্রমাগত ভয়াল নির্যাতনে বিপর্যস্ত আরসা যদি রোহিঙ্গা মানুষকে তাদের আপন জন্মভূমি ফিরিয়ে দিতে আরাকানের স্বাধীনতা চায়, আমাদের মতো মানবতাবাদীদের তাতে পূর্ণ সায় থাকবে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরও সময় এসেছে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খোঁজে বের করতে আমাদের সম্মিলিত সম্মতির বিষয়টি ভেবে দেখা এবং বিশ্বফোরামে তা তুলে ধরা।

আর কোনো গণহত্যা, অত্যাচার আমরা দেখতে চাই না। আমরা চাই, মানুষ তার নিজ জন্মভূমিতে বাঁচবে সকল নাগরিক অধিকার নিয়ে। রক্তস্রোত নয়, নাফ নদীতে বইবে শান্তির সফেদ জলধারা। সবার ওপরে সত্য থাকবে মানুষ। দুঃখ, বিপদ তুচ্ছ করে মানবতার মুক্তি ঘটুক আলোয় আলোয় এই আকাশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *