মাটির মায়ায় ছাড়তে পারছেনা ছাগলনাইয়ার মৃৎশিল্পীরা

সৌরভ পাটোয়ারী,  , ২৩ মার্চ ২০১৮:
“লাভ লসের হিসেব নয়, মাটির মায়ায় এ ব্যবসা পড়ে আছি । বাপ-দাদার পেশা কিভাবে ছাড়ি ” এ কথাগুলো বললেন ফেনীর ছাগলনাইয়ার মৃৎ শিল্পীরা । আধুনিকাতার ছোঁয়া ও কালের বির্বতনে এ উপজেলার আঁধারমানিক গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাল বংশের লোকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ গ্রামে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি পরিবার কষ্টে-শিষ্টে তাদের পূর্ব-পুরুষদের পেশা ধরে রেখেছেন। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারের সামগ্রীক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে এ শিল্প তথা মৃৎশিল্পিদের প্রতি নজর দেয়া জরুরী বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন ।

ঐতিহ্যের মাটির তৈরী বাসন, হাড়ি, পাতিল, কলসি, ব্যাংক, পিঠা তৈরীর ছাঁচ, পুতুল এখন প্লাস্টিকের দখলে। ফলে ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের উত্তর ও দণি আঁধারমানিক গ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্পের জৌলুস কমে যাচ্ছে। এক সময় এ গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পরিবার প্রত্যভাবে এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিল।
কোনপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিণ ছাড়াই মহিলা ও পুরুষ শিল্পীরা হাতের ছোঁয়ায় সুনিপুণভাবে মাটি দিয়ে চাকার সাহায্যে বিভিন্ন প্রকার মৃৎশিল্প তৈরী করে। এরপর তা রোদে শুকিয়ে জ্বলন্ত চুলোয় পোড়ানো হয়। একসময় পালরা খোলা, হাড়ি, পাতিল, কলসি, ব্যাংক, পিঠা তৈরীর ছাঁচ, পুতুলসহ ছোট-ছোট খেলনা ইত্যাদি সব জিনিসপত্র তৈরী করত। এখানকার তৈরী মৃৎশিল্পের অনেক সুনাম ও সুখ্যাতি থাকলেও এখন শুধুমাত্র দধির পাত্র ও পিঠার খোলা তৈরী করে কোন রকমের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। উল্লেখ প্রয়োজন ফেনী অঞ্চলে ‘খোলাজা’ পিঠা তৈরীর প্রধান পাত্র খোলা।

আগে মাটি বিনামূল্যে মিললেও এখন তা কিনতে হয়। এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি এসব জিনিসের জায়গা অন্য সামগ্রী কেড়ে নিলেও পিঠা তৈরীর খোলার চাহিদা এখনো বেশ। একটি খোলা তৈরীতে প্রায় পাঁচ টাকা খরচ হলেও তা বাজারে বিক্রি হয় ১০ টাকা। এর মধ্যেই রয়েছে শ্রম ও মাল বহনের খরচ। ফলে লাভের মুখ তারা দেখে না। কিন্তু অন্য কোনো কাজ না জানা, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বাপ-দাদার স্মৃতিজড়িত এ পেশা থেকে মুখ ফেরাতে পারছে না তারা। অথচ ঐ একটি খোলা এক হাত ঘুরে বাজারে খুচরা ক্রেতা কিনছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। ফলে সহজেই অনুমেয় মূল মুনাফা চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগীদের হাতে। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় মৃৎশিল্পীরা এ পেশার প্রতি হতাশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান প্রজন্ম এ ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। মৃৎ শিল্পের নিপুণ কারিগরেরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে এখন অনেকটা অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেক পুরুষ এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে গেছেন। মাটির তৈরী জিনিসপত্র আগের মত দামে বিক্রি করতে পারছে না। মাটির এ সকল পাত্রের চাহিদাওআগের মত নেই।

মৃৎ শিল্পের কারিগর নিবারন পাল বলেন, এ শিল্পের মূল উপকরণ হল মাটি। এক সময় বিনে পয়সায় মাটি পাওয়া গেলেও বর্তমানে টাকার বিনিময়েও মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যা পাওয়া যায় তা অধিকমূল্য দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

নিবারন পালের স্ত্রী সুখি রানী পাল বলেন, সব কিছুর দাম যে অনুপাতে বেড়েছে সে অনুপাতে মাটির তৈরি সামগ্রীর দাম বাড়েনি। পূর্বপুরুষের এই পেশা বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির বাজারে পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে আমাদের। বর্তমানে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক প্লাস্টিক-অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সামগ্রী। এসব সামগ্রীর দাম বেশি হলেও অধিক টেকসই হওয়াতে মানুষ মাটির তৈজসপত্র না কিনে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সামগ্রী কিনছে। তিনি আরো বলেন, মৃৎ শিল্পের এখন অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি বের হয়েছে যা আমরা আর্থিক সমস্যার কারণে কিনতে পারছি না।

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও বেসরকারীভাবে সহযোগিতা পেলে হারিয়ে যাওয়া মৃৎ শিল্পের অতীত ঐতিহ্য পুনরাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব এমনটি আশা করছেন এখানকার পাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *