ভয় সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম মাইলামের আশ্রয়প্রার্থীরা রয়ে যাবে

১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন উইলিয়াম মাইলাম। এর আগে পাঁচ বছর তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো মাইলাম ওয়াশিংটন থেকে টেলিফোনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমআলোর বিশেষ প্রতিবেদক হাসান ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলেন।

#নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা প্রশ্নে প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত বৈঠক করল। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মাইলাম: সমস্যাটি জটিল এবং জাতিসংঘের জন্য এর সহজ সমাধান নেই। রাশিয়া ও চীন খোলামেলাভাবেই বর্মি সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, তাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলছে। পশ্চিমা দেশগুলো সে কথার বিরোধিতা করেছে, কিন্তু মানবিক সাহায্য প্রদান ছাড়া বর্মি সরকার ও সেনাবাহিনীকে প্রভাবিত করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা তাদের নেই। আমি আশা করেছিলাম, অং সান সু চি এই প্রশ্নে একটি নৈতিক অবস্থান নেবেন, কিন্তু তিনিও সেনাবাহিনীর প্রদর্শিত করছেন।

# পরিষদের এই বৈঠকে রাশিয়া অব্যাহত সহিংসতার জন্য সব দোষ চাপিয়েছে তথাকথিত আরাকান রোহিঙ্গা লিবারেশন আর্মির (আরসা) ওপর। এতে কি আপনি বিস্মিত হয়েছেন?

মাইলাম: আরসার অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি সেদিন এই দলের এক নেতার সাক্ষাৎকার শুনছিলাম, তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, তারা অন্য যেকোনো বিদ্রোহী গ্রুপের মতোই। আপনাকে বুঝতে হবে, এ ধরনের চরমপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপ কেন সংগঠিত হয়। এর পেছনে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুটি ব্যাপার কাজ করে: সমাজের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্নতা ও নিজেদের দাবি পূরণে সহিংস পথ অনুসরণের আগ্রহ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের বিদ্রোহী আরও অনেক গ্রুপ রয়েছে, অধিকাংশ সরকার এসব গোষ্ঠীকে একটি আইন ও শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে, মূলত পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে তাদের মোকাবিলা করে থাকে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে যা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কথায়, তা জাতি নির্মূলকরণের ‘টেক্সট বুক’ উদাহরণ।

তুমি হয়তো জানো, ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে হিটলার পরিকল্পিতভাবে তাঁর চোখে অনভিপ্রেত এমন জনগোষ্ঠী নিজ ভূখণ্ড থেকে সরিয়ে ইউক্রেন ও পোল্যান্ডে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। ফলে প্রায় তিন কোটি মানুষ নিহত হয়। বার্মা সেই পথই অনুসরণ করছে।

# তাহলে সমাধানের উপায় কী?

মাইলাম: প্রথম পদক্ষেপ হবে সহিংসতা বন্ধ, সে ব্যাপারে সবাই একমত। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে এবং নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে আমি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেছি। সে সময়েও একবার এই সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল, লাখখানেক বা তার চেয়েও বেশি রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের অনেকেই ফিরে গেছে, কিন্তু সবাই নয়। যারা রয়ে গেল, তারা বাংলাদেশের সমাজের ভেতর মিশে গেছে। আমার ভয় হচ্ছে, বর্তমানে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো বাংলাদেশে রয়ে যাবে।

# তার মানে এসব রোহিঙ্গা এখন একা বাংলাদেশের সমস্যা?

মাইলাম: না, আমি মোটেই সে কথা বলছি না। রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, ফলে এদের বোঝা বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে বহন করতে হবে। কিন্তু এটি একা বাংলাদেশের সমস্যা নয়, গোটা বিশ্বের সমস্যা। এর সমাধানে জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, সেটি হবে অত্যন্ত নির্দয় একটি ব্যাপার।

# যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হতে পারে?

মাইলাম: দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে (বিশেষত চলতি প্রশাসনের ব্যাপারে), আমার খুব ভরসা নেই। পুয়ের্তো রিকোর ওপর ভয়াবহ দুর্যোগ গেল, অথচ আমরা তেমন কিছুই করতে পারিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে খুব কম ব্যাপারেই আমি একমত হই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যাপারে তাঁর মূল্যায়ন—রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ নেই—আমি সঠিক বলেই মনে করি।

তবে আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিশ্বের মানুষ আপনাদের সঙ্গে আছে। আমেরিকার জনগণও আপনাদের সঙ্গে।

# আপনাকে ধন্যবাদ।

মাইলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *