বধূ বেশে গিয়ে লাশ ফিরলো শিরিনের>স্বামীসহ ৫ জনের নামে মামলা

সৌরভ পাটোয়ারী, ১৮ ডিসেম্বর

তিন লাখ টাকা যৌতুকের জন্য ফেনী শহরের রামপুরে মাহমুদা আক্তার শিরিন (২৩) নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে স্বামী শাহজালাল শাহীনসহ ৫ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার রাতে মামলা দায়ের করেন নিহতের পিতা অহিদুর রহমান।মামলার অন্যান্য আসামীরা হলেন মুন্সী বজলুর রহমানের ছেলে ও নিহতের ভাসুর বেলাল হোসেন, ননদ বিবি খাতিজা মায়া, শাশুড়ী সালেহা বেগম,জা সুমী আক্তার।

হামলায় নিহতের পিতা অহিদুর রহমান উল্লেখ করেন চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামী শরীয়া মোতাবেক ঘাতক শাহজালাল শাহিনের সাথে আমার কন্যা মহমুদা আক্তার শিরিনের বিয়ে হয় । বিয়ের পর থেকে আসামিরা বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতো। যৌতুক না দেয়ায় আমার কন্যাকে তারা আমার বাড়িতে বেড়াতে আসতে দিত না।  ঘাতক স্বামী শাহজালাল তার তাকিয়ে রোডে অবস্থিত পাটোয়ারী টেলিকম ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবী করে। যৌতুক না দেয়ায় আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার মেয়েকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। একপর্যায়ে কিল-ঘুসি লোহার রড দিয়ে লোহার রড দিয়ে মেরে গুরুতর আহত করে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মৃত্যু নিশ্চিত করে কম্বল দিয়ে লাশ ঢেকে রাখে । একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য গৃহবধূ ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করতে থাকে।

শিরিনের মা আলেয়া বেগম  দাবি, স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে।সঠিক তদন্তের  মাধ্যমের কন্যা হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শ্বাস্তি ও ফাঁসি চাই।

উল্লেখ্য গত  বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় রামপুরের তনু পাটোয়ারী বাড়ীতে এ ঘটনা ঘটে। মাহমুদা দাগনভূঞার রাজাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম রামচন্দ্রপুরের ছলু ভূঁঞা বাড়ির অহিদুর রহমান ও আলেয়া বেগমের মেঝো মেয়ে । রাত ১০ টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় পুলিশ মাহমুদার শ্বশুর ও শাশুড়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ফেনী শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুদীপ রায়। তবে তার স্বামী শাহজালাল শাহীন ও ননদ খোদেজা বেগম পালিয়েছেন বলে তিনি জানান।

সুদীপ রায় জানান, আমরা এসে বিছানার উপরে চিৎ করা অবস্থায় মাহমুদার পড়ে থাকতে দেখি। তার গায়ে কম্বল জড়ানো ছিল। তার গলার দুপাশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাবার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা যাবে। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত করছে।

শিরিনের বড় বোন সুলতানা জানান,  আমার বাবা একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। আমাদের বাড়িঘর না থাকায় বিয়ের পর থেকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন শিরিনকে নানাভাবে শারীরীক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। এতে সে মানসিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়ে। এমনকি তারা শিরিনকে বাড়িতেও যেতে দিত না। আজ সকালেও সে আমাকে মোবাইলে জানায় তার স্বামী তাকে বকাঝকা ও গায়ে হাত তুলেছে।

সুলতানা বলেন, আজ বিকেলে বেলায় শিরিন অসুস্থ এবং তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে আমাদের ফোন করে শাহীন। ফোন পেয়েই আমরা ছুটে আসি। এখানে এসে দেখতে পাই আমার বোন তার শোবার ঘরের মেঝেতে পরে আছে, তার স্বামী ঘরে নেই। এসময় তার শ্বশুর বাড়ির লোকজনের কথাবার্তা সন্দেহ হলে আমরা পুলিশকে খবর দেই। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে।

সুলতানা বলেন, ছালেহা বেগমের মত স্বাস্থ্যবান একজন মহিলা সানশীট দিয়ে ঢুকে রুমের দরজা খুলতে পারবেন, এ ধরনের কোন আলামত আমরা দেখতে পাইনি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও তিনি তার সদুত্তর দিতে পারেন নি। তিনি বলেন, মাহমুদার গলায়, হাতে এবং কোমরেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ রবিউল ইসলাম ও ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আলমগীর হোসেন।

মাহমুদার মা আলেয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাত্র ১০ মাসের মাঝেই আমার মেয়েকে তারা চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। শাহীন, তার মা ও বোন মিলে আমার চাঁদের মত মেয়েকে হত্যা করেছে। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।

ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্ববল হয়ে পড়েন মাহমুদার বাবা অহিদুর রহমান। তিনি জানান, মাত্র ১০ মাস আগে আনুষ্ঠানিকভাবে শাহীনের সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। আমার ঘর দুয়ার না থাকায় তারা আমার বাড়ি যেত না। এমনকি শিরিনকে আমাদের সাথেও কোন প্রকার যোগাযোগ করতে দিত না। আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি। কিন্তু আমি এ ঘটনায় জড়িত সকলের বিচার চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *