ফের ভেজাল “ঘি”তে সয়লাব ফেনী

ফাইল ছবি

সৌরভ পাটোয়ারী, ৬ জানুয়ারি
সংবাদ প্রকাশের পর কিছু দিন থেমে থাকার পর ফের ভেজাল ঘি’তে সয়লাব ফেনী। গরুর চর্বি, ক্ষতিকারক রং, পাম অয়েল, জুতোর গাম ও ফ্লেভার মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে এ সব ভেজাল ঘি। এসব ভেজাল ঘি খেয়ে দিনের পর দিন মানুষ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বেড়েছে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিকস ও পেটের ব্যাধিজনিত নানা রোগ । বিশেষজ্ঞদের মতে দ্রুত খাদ্যে ভেজাল রোধ করা না গেলে আগামীর জনস্বাস্থ্য প্রকট আকার ধারণ করবে ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে ফেনীর শহরতলীর। বিভিন্ন হাট-বাজারে। মুদি দোকান গুলোতে দায়েরের নিচে এবং মালের পেছনে। লুকানো রয়েছে এসব ভেজাল কি। বিয়ে অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য ভোজ অনুষ্ঠানে বাবুর্চিদের মাধ্যমে এসব ভেজাল-নিম্নমানের ঘি সরবরাহ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের পরিচয় দিয়ে একটি চক্র ভেজাল তৈরীকারীদের কাছ থেকে মাসোহারা বিনিময়ে ভেজাল ঘি উৎপাদনে সহায়তা করছে।
বেশ কয়েক মাস আগে ফেনীর জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ফেনীর তালাশ ও ফেনীর তালাশ অনলাইনে এসব অনুসন্ধানীমূলক সংবাদ প্রকাশ করার পর গত এক বছর ধরে ভেজাল উৎপাদনকারীদের বন্ধ থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থাকে টাকা দিয়ে আবার দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে ভেজাল কি উৎপাদন। এসব ভেজাল ঘি’র মধ্যে রয়েছে নকল রেড কাউ,শাহী, অভি, ভি আই পি,গোল্ড ঘি, হোমল্যান্ড, কহিনুর ও বাঘাবাড়ী। এসব ভেজাল উৎপাদনে বিএসটিআই লাইসেন্স, ও সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ফেনীর প্রায় মুদি দোকানের সাথে ভেজাল ঘি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সেলসম্যানদের সাথে রয়েছে যোগসাজশ। আর মুদি দোকানির সাথে স¤পর্ক রয়েছে বাবুর্চিদের । ভেজাল তৈরী কারীরা বাবুর্চিদের জন্য এক একটি ঘি’র টিনের কোটায় রাখা হয়েছে দু-চারটি করে কয়েন। এসব কয়েনের বিনিময় বা বাবুর্চিরা কো¤পানি থেকে পাচ্ছেন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। মূলত এ টাকার লোভে বাবুর্চিরা ভেজাল ঘি গুলো চালিয়ে দেয়। ফেনী শহরের আলম বাবুচি ফেনীর তালাশকে জানান, ফেনীতে আবারো ভেজাল গিয়ে সয়লাব হয়ে গেছে। ভেজাল কি উৎপাদন করে একদিকে যেমন টি উৎপাদকরা কোটিপতি বনে গেছেন অন্যদিকে ভেজাল ঘি সরবরাহ করে এক শ্রেণীর বাবুর্চি নিæমানের ভোজন করিয়ে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে কঠিন রোগ ব্যাধির দিকে।
বেশ কয়েকজন ভোক্তা জানান এসব ভেজাল ঘি কারখানা রয়েছে ফেনী শহরতলীর ধর্মপুর, তাকিয়া রোড, সৈয়দবাড়ি রোড ও বিসিক শিল্পনগরী এলাকায়।
প্রকাশ্য কিংবা গোপনে এসব ভেজাল ঘি এর কারখানা মালিকরা সেলসম্যান নিয়োগ দিয়ে দোকানির সাথে কনট্রাক করে। আর দোকানিরা বেশি লাভের আশায় এসব ভেজাল ঘি গুলো মার্কেটে পরিচালনা করে আসছে।

ফেনীর বড়বাজারে কয়েকটি মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে। মুদি দোকানের
তাকে সাজানো রয়েছে নানান রঙের নামিদামি কো¤পানির র্ব্যান্ড। অপরদিকে ক্যাশ টেবিলের নিচে এবং বস্তায় রক্ষিত রয়েছে ভেজাল ঘি।
ভেজাল ঘি কারখানার কয়েকজন শ্রমিক ও কারিগরের সাথে কথা বলে জানা গেছে। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ভেজাল ঘি উৎপাদন কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার জেলা শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভেজাল ঘি বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। ক্ষেত্রে মাসে নামে মাত্র টাকার বিনিময়ে বিক্রয় কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমে দোকানে দোকানে এসব ভেজাল গিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। বাবুর্চিদের মোবাইল কলের মাধ্যমে ভেজাল ঘি এগুলো বিয়ের বিনোদন বিভিন্ন জিয়াফত অনুষ্ঠানে পৌছে দেওয়া হয়।

এ সব ভেজাল ঘি-র টিনের কৌটায় কারখানায় স্থান চট্টগ্রাম বিসিক এলাকার ষোলশহর ও নোয়াখালীর চৌমুহনীর বিসিক উলেলখ করা হলেও এসব ভেজাল ঘি গোপনে তৈরী হচ্ছে ফেনীর শহরের রামপুর ও ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুরে।

পোলাও, বিরিয়ানি, পরোটা, কোর্মা, হালুয়া বা যে কোনো সুস্বাদু খাবার তৈরীতে বিয়ে অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন হোটেল রেস্টুরেন্টে ব্যবহার করা হয় এসব ভেজাল ঘি। এ সুযোগে ফেনী বড় বাজারে দুই যুগ ধরে সয়লাভ হয়ে গেছে এসব ভেজাল ঘি। এসব ভেজাল ঘির কারণে আসল ঘি বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফেনীর বাজার দখলে নিয়েছে ভেজাল মিশ্রিত শাহী  গাওয়া ঘি, অভি গাওয়া ঘি, ভিআইপি  গাওয়া ঘি, এপি-ওয়ান গাওয়া ঘি, টেস্টি গাওয়া ঘি ও হোমল্যান্ড গাওয়া ঘি, বাঘাবাড়ি ঘি, কোহিনুর ঘি, মিল্ক ক্যারী ঘি, গোল্ড ঘি, এ-ওয়ান গাওয়া ঘি, কুকনি গাওয়া ঘি, সূর্য্যমুখি, রাণী ঘিসহ ডাবর গাওয়া ঘি।

বর্তমানে নকল ঘির দাপট ও চাটুকদার বিজ্ঞাপনের কাছে হার মানছে বিক্রেতা ও ভোক্তারা। ফেনী শহরের বড় বাজারের বণিক ষ্টোর, রহিম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ভ‚ঞা এন্টারপ্রাইজ, মিতালী চা বিতাণ, রাম ভান্ডার, মহসিন ব্রাদার্সসহ অনেকগুলো দোকানে ভেজাল ঘি দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। এসব নকল-ভেজাল ঘি-গুলো বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকায়। আবার কিছু কিছু ২৮০ থেকে ৫৮০ টাকায় দামে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে ফেনী শহরের লালপুলে দাগনভ‚ঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের আবুল বশরের ছেলে আনোয়ারের কারখানায় নকল ঘি কৌটায় লিখা রয়েছে আধুনিক ও স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে গাভীর খাঁটি দুধের ক্রিম দিয়ে তৈরী শাহী স্পেশাল গাওয়া ঘি। এগুলোর মূল্য ৮৫০ টাকা। কিন্তু কারখানায় ঘি তৈরীর চিত্র দেখলে ক্রেতারা স্পেশাল ঘি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। অথচ ক্রেতা আকৃষ্ট করতে সরকারী রেজিষ্ট্রি নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে। লোগো ব্যবহার করা হয়েছে বিএসটিআই এর।
শাহী স্পেশাল গাওয়া ঘি, অভি স্পেশাল গাওয়া ঘি, ভিআইপি স্পেশাল গাওয়া ঘি এগু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা। স্থির কৌটার গায়ে ব্যবহার করছেন নোয়াখালির চৌমুহনী বিসিকের ঠিকানা। অথচ ফেনীর গোপনে বিশাল কারখানায় তৈরী হচ্ছে।

ঘি তৈরীর মূল উপাদান খাঁটি গরুর দুধ হলেও এসব ঘি তৈরী হচ্ছে দুধ ছাড়াই।
একইভাবে এপি-ওয়ান গাওয়া ঘি, টেস্টি গাওয়া ঘি ও হোমল্যান্ড গাওয়া ঘি তৈরী করেন ফেনীর সদর উপজেলার ধর্মপুরের ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আজহারুল হক আরজুর বড় ভাই স্বপনও।

এ-ওয়ান ঘির এজেন্ট বড় বাজারের নারিকেল পট্রির রামভান্ডার। এসব নকল ঘি ব্যবসা করে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে তারা। সরকারও হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব ।

নোয়াখালি আবদুল মালেক মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক অসীম কুমার সাহা ফেনীর তালাশকে জানান, ভেজাল ঘি নিয়মিত খেলে ধীরে ধীরে কিডনী অকেজো হবে। এছাড়া যেকোনো বয়সে ব্রেন স্টোক ও হার্ড স্টোক হবার ঝুঁকি রয়েছে।

এ বিষয়ে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ গোলাম জাকারিয়া ফেনীর তালাশকে জানান। কারখানাগুলো খুঁজে বের করে অভিযান পরিচালনা করা হবে। ভেজাল ঘি প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *