ফেনী-৩ আসন > বিএনপিতে প্রার্থী সংকট, আওয়ামী লীগে জট

শাহজালাল ভূঞা,
সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে চলতি বছরের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে ঘিরে ফেনী-৩ নির্বাচনী এলাকা (সোনাগাজী ও দাগনভূঞায়) আওয়ামী লীগের প্রায় এক ডজন প্রার্থীর প্রচার ও পদচারণা চোখে পড়লেও দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রার্থী সংকটে ভুগছেন বিএনপি। আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী থাকায় মহাজোটের অন্যতম শরীক জাপা (এরশাদ) সুবিধা নিতে চায়। এছাড়াও জেএসডি, জামায়াতসহ ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা কৌশলে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা জাতীয় দিবস, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত হয়ে নেতাকর্মী ও ভোটারদের নিকট আগামী নির্বাচনে নিজেদেরকে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন। তারা উঠান বৈঠক করে এলাকার উন্নয়নে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরছেন এসব অনুষ্ঠানে। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করা ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যোগ দিচ্ছেন দলীয় সভা-সমাবেশে ও উঠান বৈঠকে।

 

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। অনেকে সক্রিয় রয়েছেন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ শেষ করেছেন। আসনটি মূলত বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত টানা সবকটি জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত মো. মোশাররফ হোসেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মহাজোটের শরীক জাপা (এরশাদ) এর প্রার্থী রিন্টু আনোয়ারকে পরাজিত করে জেদ্দা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী রহিম উল্যাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

নৌকার টিকেট পেতে আলোচনায় যারা :
বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনেও আসনটি ধরে রাখতে চাইছে শাসক দল আওয়ামী লীগ। এ ল্েয নৌকা প্রতীক পেতে আওয়ামী লীগের অন্তত ডজনখানেক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারা হচ্ছেন- নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবুল বাশার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আকরাম হোসেন হুমায়ুন, যুবলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম শাহীন, জেলা যুবলীগ সভাপতি ও দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা এ্যাডভোকেট এম. শাহজাহান সাজু, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী, অভিনেত্রী শমী কায়সার, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান জেডএম কামরুল আনাম, দাগনভূঞা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভাইস চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মামুন ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তালিকায় ১/১১ সেনা সমর্থিত সরকারের পরিচিত মুখ লে. জেনারেল (অব.) ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমান স্বতন্ত্র সাংসদ হাজী রহিম উল্যাহও আগামী নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইবেন।
যুবলীগ নেতা আবুল বাশার বলেন, ‘২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেনী-৩ আসনে আমাকে মনোনয়ন দেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালেও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তবে জোট রক্ষার স্বার্থে সভানেত্রীর নির্দেশেই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়ে আমি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করি। মনোনয়ন ছেড়ে দিলেও সাধারণ মানুষকে ছেড়ে যাইনি। সব সময় আমি এলাকাবাসীর সঙ্গে ছিলাম, আছি। আমার বিশ্বাস, আগামী নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রী আমাকে মূল্যায়ন করবেন।’
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন জানান, ২০০১ সালের পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে রয়েছি। দলীয়ভাবে মনোনয়ন দিলে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবো।
সুমন চন্দ্র ভৌমিক নামে এক ভোটার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে ফেনী-৩ আসনের জন্য একজন তরুণ নেতার প্রয়োজন। যিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারবেন, আমরা তাকেই প্রার্থী হিসেবে চাই।
জেলা যুবলীগের সভাপতি দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন বলেন, ছাত্রজীবন থেকে দলের অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে অনেক মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। আওয়ামী লীগের দুর্দিনেও দল ছেড়ে একদিনের জন্যও এলাকা ত্যাগ করিনি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব। আশা করছি, দলীয় সভানেত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখবে।

প্রার্থী সংকটে বিএনপি :
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মামলা-হামলায় কাবু বিএনপির কর্মকান্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। বিএনপির সম্ভব্য দলীয় প্রার্থী হিসেবে অনেকের নাম আলোচনা হলেও তবে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় নেই। দলীয় গ্রুপিং রাজনীতির কারণে মামলা হামলার শিকার নেতাকর্মীদেরও তেমন খবর নিচ্ছেন না কেউ। তবে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মহিলা দল নেত্রী অ্যাডভোকেট সাহেনা আক্তার শানু, সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক সাদরাজ জামান।
সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন- নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়াও নিজ এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখায় তার গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। তবে দলগতভাবে যে সিদ্ধান্ত নিবে সেটিই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক সাদরাজ জামান জানান- আমাদের দলের চেয়ারপার্সনসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাবন্দি। এছাড়াও নেতাকর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হয়ে ফেরারী জীবন-যাপন করছেন। আমি দলের জন্য কাজ করছি এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে দলের সিদ্ধান্ত মতে কাজ করবো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী জানান- সাবেক এমপি মোশাররফ হোসেন মারা যাওয়ার পর অভিভাবকহীন অবস্থায় আছে ফেনী-৩ আসনের বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এখন পর্যন্ত দলের কোন প্রার্থী এলাকামুখী নেই। এছাড়া উপজেলা নেতাদের অনেকে আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে না থেকে পদ নিয়ে ঢাকায় বসে থাকেন। তাই দলের ত্যাগী ও সক্রিয়দের যথাযথ মূল্যায়ন করার দাবি জানান।

অপরদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রচার ও প্রকাশনা উপদেষ্টা রিন্টু আনোয়ারকে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দিলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেদ্দা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী রহিম উল্যাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে সক্রিয় থাকায় এবারো মহাজোটের প্রার্থী হতে পারেন জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রচার ও প্রকাশনা উপদেষ্টা রিন্টু আনোয়ার। তিনি জানান- পার্টির চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে দলের প্রার্থী হিসেবে ফেনী-৩ নির্বাচনী আসনে আমার নাম ঘোষনা করেছেন। এছাড়া নির্বাচনে মহাজোট যদি থাকে যেহেতু বিগত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে এই আসনটি ছেড়ে দিয়েছিলো, সেহেতু একাদশ নির্বাচনেও প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি এ আসনটি পাবে বলে আশাবাদী।
এছাড়াও প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেএসডির কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, জামায়াতের আমীর মকবুল আহমদ, ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ফখরুদ্দিনসহ বেশ কয়েকজনের নাম। তবে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যদলের প্রার্থীদের মাঠে তেমন দেখা যাচ্ছে না।
এই আসনের ভোটার ফেরদৌস আরা নামে এক শিক্ষিকা জানান- আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো। তাই এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখবে এবং সুখে-দুখে পাশে থাকবে এমন যোগ্য প্রার্থীকেই আমরা নির্বাচিত করতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *