ফেনীর শহীদ বুদ্ধিজীবি কবি, সাহিত্যিক, লেখিকা- “মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন” এর প্রতি শ্রদ্ধাঃ

১৪ই ডিসেম্বর,২০২০(শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,ঢাকা)-

১৪ ডিসেম্বরে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে একমাত্র মহিলা সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, লেখিকা বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে পাকিস্তানী ও তাদের এ দেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। আজিমপুর নতুন কবর স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। শহীদ সেলিনা পারভীন “শিলালিপি” পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন এবং তখন তিনি ললনা”
পত্রিকায়ও কর্মরত ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ বুধবার বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জের ছোট কল্যাণনগর গ্রামে। পৈত্রিক নিবাস ফেনী জেলার মাষ্টার বাড়ী ‘শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক’ (সাবেক নাজির রোড)।
১৯৭১ সালে কবি নির্মূলেন্দ গুণ, সাহিত্যিক শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক বেবী মওদুদ(এমপি), আখতার হোসেন, আহাম্মেদ নূরে আলম তখন তাঁর সহকর্মী হিসাবে ললনায় কাজ করতেন । তাঁর বিভিন্ন লেখা, কবিতা, প্রবন্ধ তখন দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান (অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা), দৈনিক পূর্বদেশ, লালনা, বেগম, এবং শিলালিপি প্রভৃতি-তে প্রায়ই ছাপা হতো । বেগম পত্রিকায় তিনি এক সময় চাকুরী করেছেন। তাঁর সাথে তখন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামাল, ড: নিলিমা ইব্রাহিম, প্রবীন সাংবাদিক ওবায়দুল হক, সাবেক সংসদ সদস্য রাজিয়া মতিন চৌধুরী, কবি শামছুর রহমান, কবি গোলাম মোস্তাফা, রফিকুন নবী (রনবী), হাশেম খান, ফজল সাহাবুদ্দিন, কবি গাজী শাহাবুদ্দিন, লেখিকা মালেকা বেগম, অভিনেত্রী সুমিতা দেবী, নাট্য শিল্পী লায়লা হাসান, সাহিত্যিক মকবুলা মনজুর, বেগম পত্রিকার সম্পাদিকা নুরজাহান বেগম, অধুনালুপ্ত দৈনিক মুক্তকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক-কেজি মুস্তাফা, সাপ্তাহিক ২০০০ এর সম্পাদক সাহাদাৎ চৌধুরী, ললনা পত্রিকার সম্পাদক ১৯৭১ এর শহীদ মোহাম্মদ আক্তার সহ আরো অনেকের যোগাযোগ ছিল। ১৯৭১ সালে তিনি নিজেকে মুক্তি সংগ্রামে জড়িয়ে ফেলেন। তাঁর নিজস্ব পত্রিকা “শিলালিপি” স্বাধীনতার পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান কালের দেশ বরেন্য কবি/সাহিত্যিকরা ছাড়াও শহীদ জহির রায়হান, শহীদ মনির চৌধুরী, শহীদ শহীদুল্লাহ্ কায়সার, এবং আরো অনেকের লেখা তাঁর পত্রিকায় ছাপা হতো। “শিলালিপি” পত্রিকার বিক্রয় লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি সেই সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ঔষধ, অর্থ ও খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন । ঐ সকল কর্মকান্ডের জন্যই তিনি স্বাধীনতার বিপক্ষের লোকদের নজরে পড়ে যান। পত্রিকাটি তৎকালীন সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । ফলশ্রুতিতে ১১৫, নং সিদ্ধেশ্বরীর বাসা (বর্তমানে- ২৯, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক) থেকে দুপুরে ভাত খাবার পূর্বে তাঁরই হাতের গামছা দিয়ে তাঁকে চোখ বেধে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনির কমান্ডার ইনচার্জ ফেনীর কুখ্যাত রাজাকার নরপিশাচ চৌধরী মইনুদ্দিন এর সহায়তায়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সাংবাদিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ সাংবাদিকদের নামের ‘নাম ফলকে’ তাঁর নাম অঙ্কিত আছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসাবে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরিজ ৯১’ এ তাঁর নামে ডাক টিকেট প্রকাশ করেছে (১৪ই ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে)। সরকার পাঠ্য পুস্তকের পঞ্চম শ্রেণীর বইয়ে তাঁর উপর তথ্য সংযোজন করেছে। বাংলা একাডেমী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকায় ও প্রকাশিত বই “শত শহীদ বুদ্ধিজীবী গ্রন্থ” ও “শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থ” এবং “স্মৃতি-৭১” (৪র্থ খন্ড) এ তাঁর উপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । ড: রফিকুল ইসলাম কর্তৃক সম্পাদিত বই “বীরের এ রক্ত শ্রোত মাতার এ অশ্রুধারা” ও ফরিদা আক্তার সম্পাদিত “মহিলা মুক্তিযোদ্ধা গ্রন্থ” এ তাঁর কথা লেখা হয়েছে। রক্তের ঋণ সংগঠন প্রকাশিত গ্রন্থ “শহীদ সাংবাদিক” এবং লেখিকা-সাহিত্যিক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা পান্না কায়সার সম্পাদিত বই “হৃদয়ে-একাত্তর” (প্রথম খন্ড) এ তাঁর উপর বিশদভাবে লেখা আছে। প্রিপ ট্রাষ্ট কর্তৃক ডঃ নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ সম্পাদিত বই “মুক্ত মঞ্চে নারী” তে তাঁর বীর গাঁথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। বৃটিশ চ্যানেল ফোর কর্তৃক “ওয়ার ক্রাইম ফাইল্স” এবং বিবিসি কর্তৃক “হাউ দ্যা ইস্ট ওয়াজ ওন” তথ্যচিত্রে তাঁর উপর তথ্য ও আলোকচিত্র সংযোজিত আছে। জাতীয় জাদুঘরে এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত আছে। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হতে তাঁকে বিশেষ স্বীকৃতি পত্র (’৭১এর শহীদ হিসেবে) দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এর গেজেটে তাঁর নাম সংযোজন করা হয়েছে এবং সনদও আছে। প্রশিকার অর্থায়নে শামিম আখতার এর নির্দেশনায় শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন এর জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচিত্র “শিলালিপি”, এই ছবিটি উৎসর্গও করা হয়েছে তাঁকে। ঢাকার মৌচাক মোড় হতে মগবাজার পর্যন্ত রাস্তাটিতে এবং এর উভয় পার্শ্ব “শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক” নামে নামকরণ করা হয়। ফেনী পৌরসভা নাজির রোড এর কিছু আংশের নাম করন করেছে, ‘শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক’। শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন স্মৃতি রক্ষা পর্ষদ ১৯৯৬ এর ২১শে ফেব্রুয়ারী “শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন স্মারক গ্রন্থ” প্রকাশ করেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *