ফেনীর একই পরিবারের ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাঃ

৬ই ডিসেম্বর,২০২০(শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,ঢাকা)-

আজ ৬ই ডিসেম্বর।ফেনী মুক্ত দিবস।ফেনী-বিলোনিয়ার ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অনেক প্রানের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে এই অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়।এই ভয়াবহ যুদ্ধের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেন জাফর ইমাম বীর বিক্রম।তিনি সহ একই পরিবারের আরো ৪ জন সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন।একই পরিবারের এই ৫ জন বীর সন্তান এখনো বেঁচে আছেন।ফেনী মুক্তির কারিগর জাফর ইমাম বীর বিক্রম(সাবেক মন্ত্রী) ছাড়াও ফেনী জেলার ফুলগাজী থানার নোয়াপুর গ্রামের একই পরিবারের ডাঃশেখ হাসান ইমাম জাহাংগীর(আমেরিকা প্রবাসী),বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মহিউদ্দিন চৌধুরী(অবঃসিনিয়র এ,এস,পি,পুলিশ),মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালউদ্দিন চৌধুরী,সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা শেখ নিজামউদ্দিন চৌধুরী এখনো জীবিত।ফেনীর তালাশ এই জীবিত বীরদের ফেনী মুক্ত দিবসের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

এই তারিখে সকালবেলা হতে  জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত ফেনী শহর তথা গোটা মহকুমার, থানা ও প্রত্যন্ত জনপদ। বিজয় উৎসবের মধ্য মনি বিখ্যাত বিলোনিয়া যুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমাম বীর বিক্রম।

এই বিখ্যাত বিলোনিয়া যুদ্ধের রণকৌশল, প্রতিরক্ষা ব্যুহ, আক্রমণের পর প্রতি আক্রমণ সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর ১২০টি দেশের মিলিটারি একাডেমীর পাস্ট স্টাফ কলেজে পাঠ্য।জাফর ইমামদের নোয়াপুরের বাড়িতে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্প করেছিলো ।বাড়ির মসজিদের সামনে খনন করা হয়েছিল বাঙ্কার যেখানে অস্রধারি পাকিস্তানী সেনারা পাহারা দিত।বসতবাড়ি রাজাকারদের সহায়তায় পাক আর্মি জ্বালিয়ে দিয়েছিল।পুরো পরিবার ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো।এখন যেখানে বেলা ভবন সেখানে বিমান থেকে গোলা নিক্ষেপের কারনে বড় গর্ত তৈরি হয়েছিলো।

বাড়ী পোড়ানোর সংবাদ যখন শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে জাফর ইমামের কনিষ্ঠ চাচা শেখ সিদ্দিকউল্লাহ চৌধুরী তখন হেসে বলেছিলেন,বাড়ীতে অনেক ইঁদুর হয়েছিলো, যাই হউক বাড়ি ইঁদুর মুক্ত হলো।
এই পরিবারের মক্তিযোদ্ধারা,যারা দেশের জন্য নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন আমাদের তাদের শ্রদ্ধার প্রথম কাতারে শামিল করি।
আজ এই পরিবারের দুইজন মুক্তিযোদ্ধার জবানীতে সেইসময়কার বাস্তবতার কথা তুলে ধরছি ফেনীর তালাশের পাঠকদের জন্য।
বাংলা মায়ের দামাল ছেলে কামালঃ
শহীদ সুবেদার নুর ইসলামের মৃত্যু চোখের সামনে দেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালউদ্দিন চৌধুরী।রাতের বেলা বাঙ্কার থেকে উপরে উঠে ধুমপান করছিলেন সুবেদার নুর ইসলাম।একই বাংকারে কামালও ছিলেন।মুন্সিরহাট মুক্তারবাড়ি ডিফেন্সে অগ্নীশলাকার অগ্নী লক্ষ্য করে পাক আর্মি এল,এম,জির ফায়ার করে।আর রক্তে রঞ্জিত হয় সেই বাংকার।শহীদ হন সুবেদার নুর ইসলাম।এই চোখের সামনে সহযোদ্ধার মৃত্যু কামালকে রনাংগন থেকে এক চুলও নাড়াতে পারেনি।বরং সে হয়ে উঠলো এক অকুতোভয় যোদ্ধা।ফেনী বিলোনিয়া যুদ্ধের স্মৃতি স্মরন করতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা কামাল।উপ সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমাম বীর বিক্রম গাবতলা ক্যাম্পে বসে কামালকে দায়িত্ব দিলেন নোয়াপুর রেকী করার।কামাল্লা এবং বদরপুরের মাঝ পথ দিয়ে তিনি একটি হ্যান্ডগ্রেনেড নিয়ে সিলোনিয়া নদী পার হন।নোয়াপুর পশ্চিম মাথায় বড় মিয়াদের বাড়ির সামনের মসজিদের পাশে বুনো ঝোপে হ্যান্ডগ্রেনেডটি রেখে এগুতে থাকলেন কামাল।বটতলী বাজারে যখন পৌছলেন দেখতে পেলেন দু,একটি দোকান খোলা,মানুষজন তেমন একটা নেই।কামালদের পাশের বাড়ির ধন মিয়া কেরানী কামালকে দেখেই বললেন”আপনাদের বাড়িতো পাক আর্মি পুড়িয়ে দিয়েছে,আর কি দেখবেন?এসেছেন যখন চলেন,তবে প্রথমেই পাক ক্যাপ্টেনকে একটা লম্বা সালাম ঠুকতে হবে।“বটতলী পেরিয়ে বাড়ির কাছাকাছি যেতেই পাক সুবেদার কামালের দিকে স্টেনগান তাক করে বললো”এ বাচ্চু ইধার আও।“পোড়া বাড়ির ভিটের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো এবং দেখতে পেলো একটা স্টিলের আলামারীর উপর বসে আছে পাক ক্যাপ্টেন পায়ের উপর পা তুলে আর মিলিশিয়ারা হান্ডি পাতিল গুলোকে লাথি মেরে সরাচ্ছে।সুবেদার আবার প্রশ্ন করলো”তুম কেয়া করতেহো?”কামাল উত্তর দিলো”হাম ক্ষেতি খামারী করতাহে।“আবার প্রশ্ন”তুমারা ঘর কাহাহে?”কামাল পাশের মোল্লা বাড়ি দেখিয়ে বললো”উহাহে হামারি ঘর।“ইতিমধ্যে স্টিলের আলমারির উপর বসা ক্যাপ্টেন বিশয়টা খেয়াল করলো এবং বলে উঠলো”কেয়া হুয়া?”সুবেদার উত্তর দিলো”স্যার,ইয়ে আচ্ছা জওয়ান হ্যাঁয়,ইয়ে আদমী মুক্তি হ্যাঁয়।“তখন ক্যাপ্টেন লুংগী,গেঞ্জি পরা কামালকে ভালোভাবে দেখে বললো”বাখোওয়াছ মাত করো,ইয়ে বাচ্চা আদমী হ্যাঁয়,উছকো ছোড় দো।“এবার সুবেদার তার দিকে কোমল চোখে চেয়ে আবার বললো”তুম হামারা এক কাম কউর দো,উহাপে মুন্সিরহাটমে হামারী লংগরখানাহে,তুম খানা লেকার আও।“এসময় রুস্তম নামে একজন যে কিনা কামালদের বাড়িতে কাজ করতো সে পাক আর্মির ফুটফরমাশ শুনতো একটা খিরা চিবোতে চিবোতে এগিয়ে আসলো এবং সুবেদারকে বললো”ইয়ে আদমীকি ঘরমে জরুরুত হ্যাঁয়,খানা মে লেকার আউওংগা।“আর কামালকে রুস্তম ইশারায় খিরা ধরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বললো।
কামাল জোর কদমে হাটা শুরু করলো।মোল্লা বাড়ি দিয়ে ঢুকে পেছনের পুকুর পেরিয়ে আবার যখন বটতলার দিকে গেলো দেখা হলো আওয়ামীলীগ নেতা মালেক সওদাগরের সংগে।তিনি বললেন”আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান,পরিস্থিতি খুব একটা ভালোনা।“নোয়াপুর গ্রামে তিনজন রাজাকার ছিলো।তাহের,সাদেক এবং নুরুল ইসলাম মৌলভী।এদের যে কোন একজন পাক আর্মিকে জানিয়ে দেয় একটু আগে যে কিশোরকে জেরা করা হয়েছে সে মুক্তি।কামাল প্রানপনে দৌড়ে একমাত্র সম্বল হ্যান্ডগ্রেনেডটি ঝোপ থেকে নিয়ে সিলোনিয়া নদীর পাড়ে পৌছে।ঠিক তখনি কানের কাছ দিয়ে সোঁ শব্দ করে একটা বুলেট গেলো।সাথে সাথে কামাল নদিতে ঝাপ দিলো।নদীতে স্রোত ছিলো।স্রোতের টানে ভেসে ভেসে প্রায় এক মাইল দূরে চন্দু পাটোয়ারীদের পুকুরের কাছে পৌছে গেলো।চন্দু পাটোয়ারী ছিলো কামালের বন্ধু বাচ্চুর বাবা।পুকুরে চাল ধুচ্ছিলেন বাচ্চুর মা।কামালকে দেখেই বলে উঠলেন”আরে চৌধরীর হুত,কিল্লে এত কষ্ট করওর,এই দেশ কি স্বাধীন অইবো?”তিনি তাকে বাচ্চুর শুকনো কাপড় দিলেন পরতে এবং ঘরে নিয়ে বসালেন।একটা বড় থালায় ভাত,দুধ আর কলা খেতে দিলেন।ক্ষুদার চোটে গোগ্রাসে খেয়ে নিলো কামাল।খাওয়া শেষ করে সেই বাড়িতে বসেই রেকী প্ল্যান ম্যাপের মত করে সাদা কাগজে এঁকে নিলেন।সেই রিপোর্ট পরে জমা দিলেন সাব সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমাম বীর বিক্রমের কাছে।সে রাতে রেকী ম্যাপ বেইস করে আর্টিলারি শেলিং করা হলো।শেলের আঘাতে কামালদের বাড়ির সামনের পুকুরের উত্তর পূর্ব কোণায় বাংকারে চার পাক আর্মি মারা গেলো।সেরাতেই পাক আর্মি কামালদের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে নোয়াপুর বিওপি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।
এই স্মৃতিচারনের সময় মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালউদ্দিনের চোখে জুড়ে ছিলো রনাংগনের সেই সময়কার বাস্তবতা।নিজের জীবন তুচ্ছ করে যে যুদ্ধ করেছিলেন,যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি একটি সমৃদ্ধ দেশ দেখাটাই আত্মতৃপ্তির পাথেয় বলে মনে করেন। জাতীর শ্রেষ্ট সন্তানের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা।
একজন নিভৃতচারী কিশোর মুক্তিযোদ্ধাঃ
শেখ নিজামউদ্দিন চৌধুরী।মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ১২বছর।ফেনী ফুলগাজী থানার নোয়াপুর গ্রামে জন্ম নেয়া এই মহান ব্যাক্তি নিজেকে কখোনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবী করেননি।কিন্তু পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ায় সেসময়ের কিশোর নিজামউদ্দিনের অবদান শুনলে আপনাদের পিলে চমকে যাবে।এই পরিবারের বিলোনিয়া সাব সেক্টর কমান্ডার কর্নেল জাফর ইমাম বীর বিক্রমের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজামউদ্দিনের বড় দুই ভাই শেখ মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ কামালউদ্দিন চৌধুরী যখন সশস্র যুদ্ধে লিপ্ত এই কিশোর তখন সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছিলো।যুদ্ধে অংশগ্রহনের কারনে নিজামের পুরো পরিবার তখন ভারতের চোত্তাখোলা নামক স্থানে শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত,এই কিশোর তখন ছিলো শরণার্থী শিবির এবং বাড়ির একমাত্র যাতায়াতকারী এবং সংবাদ বহনকারী।প্রতিদিন না হলেও প্রায়দিন সিলোনিয়া নদী সাতার কেটে বাড়ির আশেপাশে রাখাল ছেলেদের সাথে মিশে গিয়ে পাক আর্মির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন।পাক আর্মি বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপনের পর বসতবাড়ি যখন জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো তখনও তিনি পাশের মোল্লা বাড়ি থেকে দেখছিলেন।চালের বস্তার ভেতর গ্রেনেড বহন,পাক আর্মির কার্যকলাপ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বর্ণনা এসবই যুদ্ধের সময়কার এই সাহসী কিশোরের নিয়মিত কাজ ছিলো।দুই দুইবার পাক আর্মির হাতে ধরা পড়লেও অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান তিনি।একবার প্রতিবেশীরা তার ভিন্ন পরিচয় দিয়ে বাঁচান তাকে কৃষকের ছেলে বলে আরেকবার দুই পাক জওয়ান তার হাত এবং পা ধরে দুলাতে দুলাতে একটা ব্রিজ থেকে নদীতে ছুড়ে ফেলার মুহূর্তে সেখানে এক কৃষক আবারও তার পরিচয় কৃষকের সন্তান বলে তাকে পালাতে সাহায্য করে।
জাতীর এই ক্রান্তিলগ্নে অনেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে তখন এই সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা একবারের জন্য ও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করেননি,সুবিধা নেয়া তো দূরে থাক।
শ্রদ্ধা জানাই এই নিভৃতচারী কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে।

আজকের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের এই জীবিত বীরদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে।একই পরিবারের এতজন মুক্তিযোদ্ধা ইতিহাসে বিরল।এই জীবিত বীরদের সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *