ফেনীতে ফসলী জমি ধ্বংস করে মাঠি কাটার মহোৎসব !

নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশে ফসলী জমি ধ্বংস করে মাঠি কাটার রোধে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই । ফলে সোনা ফলানো মাঠ ধ্বংস করে মাঠি বিক্রির মহোৎসব চলছে ।
এ সময়ের মাঠের পর মাঠ সোনালী আমন, কৃষকের মুখে নবান্নের হাসি, ধান মাড়াইয়ে কৃষাণিদের ব্যস্ততা, উঠান জুড়ে ধান শুকানো ও গোলা ভরা ধানের দৃশ্য গ্রামীণ জীবনে শুধুই স্মৃতি।

সোনা ফলানো সেই মাঠে ধান কাটার কাচির বদলে চলছে কোদাল আর ইটভাটার ট্রাক্টর। কৃষি ভূমি রূপান্তর হয়েছে পতিত ভূমিতে। কোথায়ও আবার গভীর গর্ত হয়ে যাওয়ায় সে সব জলশয়ে জাল দিয়ে মাছ ধরা হয় । ফসলী জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় নিচু জমিগুলো পরিণত হয়েছে ছোট পুকুরে । এ দৃশ্য ফেনী জেলার অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে ইটভাটা স্থাপিত হয়েছে। এতো কিছুর পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইটভাটায় মাটি ক্রয়-বিক্রি রোধে কোনরকম পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট প্রসাশন এমন অভিযোগ সচেতন মহলের ।

জেলা রাজস্ব অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৯২৮.৩৪ বর্গমাইল আয়তনের ছোট এই ফেনী জেলায় লাইসেন্সভুক্ত ইটভাটার সংখ্যা হচ্ছে ১০৫টি। তার মধ্যে ফেনী সদরে রয়েছে ৫৯টি। দাগনভূঁঞায় ২৭টি। ৮ থেকে ১০ একর জমি ধ্বংস করে গড়ে ওঠে একেকটি ইটভাটা। আবার ইটভাটার জন্য মাটিও কেটে নেওয়া হয় আবাদি জমি থেকে। ফেনীর গ্রামাঞ্চলে কৃষিজমির সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ঘটাচ্ছে ইটভাটাগুলো।

বিলাসপ্রিয় ফেনী জেলার মানুষ প্রতিনিয়ত তৈরি করছে বহুতলভবন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট। এ ইটের যোগান দিতে তৈরি গড়ে উঠছে অপরিকল্পত ইটভাটা। নগদ অর্থের লোভে এসব জমি থেকে ইটভাটায় মাটি বিক্রি করে সর্বশ্রান্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। ফসলীভূমি যখন জলাশয়ে পরিণত হয়- তখন ফসল-মাছ দু’টি থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষক জমি বিক্রি করে এক পর্যায়ে ভূমীহীনে পরিণত হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবেও ফেনীতে ইটভাটার সংখ্যা ১০৫টি। এসব ইটভাটায় বছরে অন্তত দেড় কোটি টন মাটি লাগে, এজন্য বছরে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়া হয়।
জমির মালিকরা মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা বিঘা হিসেবে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। মাটি কাটার ফলে জমির উপরিভাগে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চির মধ্যে থাকা জমির খাদ্যকণা ও জৈব উপাদান নষ্ট হচ্ছে।

ফলে ওই সব জমির উর্বরতা হ্রাস পায়, তাতে যে ফসল আবাদ হয় তার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ ছাড়াও জমির উপরিভাগ মাটি কাটার ফলে জমি নিচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওই সব জমিতে ধান রোপণ করা যাচ্ছে না।
এসব ইটভাটার ফলে একদিকে যেমন আবাদি জমির উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে, অন্যদিকে বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের।

আজ গ্রাম পরিণত হচ্ছে নগরে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ছোবলে হায়িছে যাচ্ছে কৃষি জমি। আর এ থেকে কোথাও গড়ে উঠছে আবাসন, কোথাও হচ্ছে শিল্প কারখানা। এমনকি ইটভাটার জন্যও প্রতি বছর হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদিতে পরিণত হচ্ছে । ফেনীর ইটভাটা এলাকায় ধানের জমি মাছের জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে । এরপরও ফেনী উপকূলীয় জেলা হওয়ায় এখানে আঘাতহানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ফসলি (আমন-ইরি-আউশ-রবি শস্য) জমি এখন ফসলহীন ধু ধু নিচু মাঠ। কোথাও আবার পুকুরের মতো জলাশয়। মাটি ভরাট করে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ফলে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা প্রশংসনীয় হলেও মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুটোই আগামীর খাদ্য সংকটকে ক্রমান্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়
নিয়ে যাচ্ছে ।
ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউপির উত্তর কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান পাটোয়ারী জানান, পার্শ্ববর্তী জমি কেটে ফেললে জমিতে পানি ধরে রাখার স্বার্থেই তাদের জমি কেটে সমান করতে হচ্ছে । বর্মমানে জমি নিচু হয়ে যাওয়ায় ধান হয় না । ইটভাটায় মাটি বিক্রি রোধে প্রয়োজন ভ্রাম্যমান আদালত গঠন করে ভাটা ও ভূমি মালিক ঊভয়ের জরিমানা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি ।

শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে লোভের কারণে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। এজন্য আইন পরিবর্তন করে উর্বর ও কৃষি উপযোগী জমি রক্ষা এবং ফসলী জমির অবাদ ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে শাস্থিমূলক ব্যবস্থার কথা বার বার বলা হয়েছে। কিন্তু‘ কোনো বিধিবিধান এ পর্যন্ত করা যায়নি।
জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১৩ এ বলা হয়েছে- কৃষিজমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষিজমি ধ্বংস করে ইটভাটা, বাড়িঘর, শিল্প কারখানা, অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না। তবে এমন নামমাত্র আইন থাকলেও এর জন্য শাস্তির বিষয়টি ¯পষ্ট নয়।

দাগনভূইয়া উপজেলার ছমির মুন্সি গ্রামের ভূমি মালিক জানে আলম টিপু জানান, এভাবে জমির উপরিভাগ কাটা হলে কী ক্ষতি হয় তা তারা তেমন জানেন না। তবে কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে – এমন কথা স্বীকার করে তারা বলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আর্থিক অনটনে পড়ে বাধ্য হয়ে তারা জমির মাটি বিক্রি করছেন।
বেসরকারি এক হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতিটি ইটভাটা এক মৌসুমে ৩০ লাখ ইট উৎপাদন করে থাকে। ১২০ ফুট চিমনি বা নতুন নিয়মে জিগজ্যাগ চিমনির কোনটাই নেই এখানকার
অধিকাংশ ইটভাটায়। গড়ে ১ ফুট গভীরতায় মাটি কাটা হলে একটি ভাটার জন্য বছরে মাটির প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ১২ একর জমির।
ফেনীর সদর উপজেলার কৃষি অফিসার আবু নাঈম মোঃ সাইফুদ্দীন জানান, ফেনী পশ্চিমাঞ্চলে এখন আর আমন-ইরি ধান হয় না। সর্বত্রই উঁচা-নিচা ভূমি। ইটভাটায় মাটি দিয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হচ্ছে। নিজ পায়ে নিজে কুড়াল মারছেন।

ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মামুন জানান, ইট প্রস্তত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ধারা ৫ অনুয়ায়ী কৃষি জমির মাটি কেটে ইট প্রস্তত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একটি কৃষি জমির হিউমাস সমৃদ্ধ টপ সয়েল তৈরি হতে ২৫-৩০ বছর সময় লাগে। সে মাটি কেটে ইট বানানোর মাধ্যমে জমিটি দীর্ঘ মেয়াদে তিগ্রস্ত হয়। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা কৃষকদের এ বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কাঁচা টাকার লোভে অনেকেই টপ সয়েল বিক্রি করে দেয়। এ অবস্থায় আমাদের যার যার অবস্থান থেকে ইটভাটাগুলো যাতে আইন মানতে বাধ্য হয় সে জন্যে কাজ করতে হবে। এ ব্যপারে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ড. খালেদ কামাল বলেন, কৃষি জমির মাটির উপরের সয়েল নষ্ট না করার ব্যপারে সম্প্রতি আমরা সমন্বয় সভা করেছি । মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ আছে কৃষি জমি নষ্ট করলেই প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে । কৃষককে আমরা উদ্বুব্ধ করা জন্য কাজ করছি । ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কৃষি জমির মালিক যারা ইটভাটায় মাটি বিক্রি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা বা জরিমানা করলে তারা ভয় পাবেন। তারা যে ক্ষতি করছে সেটা জাতির ক্ষতি এটা বুঝাতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা সভাসমাবেশে ও স্যাটেলাইট টিভিতে এ সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *