প্রবাসী মাহবুবের স্বপ্নের মৃত্যু

সৌরভ পাটোয়ারী, ১২ মার্চ।।
তিল তিল করে লালিত স্বপ্নের কবর রচনা হলো একটি বিস্ফোরণে। গ্রাম জুড়ে নামলো শোক। প্রবাসী হারালেন স্ত্রী, কন্যা। বোন হারালেন মা -বোনকে। ক্ষত-বিক্ষত হলো একটি পরিবার।
প্রবাসী মাহবুবুল ইসলাম। পিতার নাম হাজী আবুল কাশেম ভূঞা। চট্টগ্রাম জেলা মিরসরাই উপজেলার করের হাট ইউনিয়নের লক্ষীচড়া গ্রামের অধিবাসী। আবুধাবীর দুবাইতে থাকেন প্রায় তিরিশ বছর। নিজে ইসলাম ধর্মভীরু লোক হিসাবে তিনি বিয়ে করেছেন আরেক ধর্মভীরু পরিবারের একই ইউনিয়নের মেয়ে মেহেরুন্নেসা লিপিকে। বিয়ে করার পর দুটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পুত্র সন্তানের আশা ত্যাগ করে তিল তিল করে গড়া শুরু তার পরিবারকে । দুই মেয়ের ছায়া হিসেবে স্ত্রী মেহেরুন্নেসা শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। ইসলামী রীতি নীতি অনুসারে তিনি তার মেয়েদের নাম রেখেছেন নিজের নামের সাথে মিলিয়ে ইসলামী নাম ফারহা ইসলাম ও হাফসা ইসলাম। জীবনটাও চলছিল ধর্মভীরু নিয়মে। দুটি কন্যা সন্তান মানুষের মতো মানুষ করতে হবে সেই চিন্তা মাথায় রেখে এবং উপযুক্ত মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়তে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ফেনী শহরে ফেনী এসে শফিক ম্যানশনে বাসা ভাড়া নেন। শফিক ম্যানশনে বাসা ভাড়া নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একটি। তার পাশে রয়েছে ভালো একটি স্কুল সেই ভালো স্কুলে পড়ালেখা করছিল হাফসা এবং ফারহা। ফারহা ইসলাম তাদের বড় মেয়ে। সে এবার মেধাবী তালিকায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছে । অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ ৫ ও এইচ এস সি তে জিপিএ ৫ পেয়ে মেধাতালিকায় অবস্থান করছিল। ফারাহা ইসলামের ছোট বোন হাফসা ইসলামও অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ ৫ পেয়ে মেধাতালিকায় অবস্থান করে।
কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার কি লীলা খেলা। কেউ আগে, আর কেউ পরে ,পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে এটাই নিয়ম। এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি হাফসা ইসলাম ও মা মেহেরুন্নেসার বেলায়ও। বিধাতার সেই নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যখন তিল তিল করে স্বপ্ন দেখছিলেন প্রবাসী মাহবুবুল ইসলাম ঠিক তখনই তাঁর পরিবারের উপর নেমে এলো এক কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় ভেঙে গেল মরে গেল প্রবাসী মাহবুবের স্বপ্ন।
স্বপ্ন সবাই দেখেন স্বপ্ন দেখতে সবাই পছন্দ করেন স্বপ্ন দেখতে সবাই ভালোবাসেন কিন্তু সেই স্বপ্ন অকালে ঝরে যাবে কে জানতো। কে জানতো ৫ মার্চ রাত সাড়ে দশটায় শফিক ম্যানশন এ বিস্ফোরণ ঘটবে। ভয়ঙ্কর বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় সেই ভবনটি। অনেকে মন্তব্য করছিলেন যে এখানে কোন জঙ্গি হামলা হয়েছে। কিন্তু না পুলিশ বোমা ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দল এটিকে একটি নিশ্চিত দুর্ঘটনা বলে অবহিত করেছেন। সবই মহান রাব্বুল আলামিনের ইশারা। আমরা বলছিলাম ফেনী শহরতলীর শফিক ম্যানশনের বিস্ফোরণের কথা। গত ৫ মার্চ শফিক ম্যানশনের ইতিহাসের পাতায় কালো রাত্রি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে সারাটা জীবন। দগ্ধ হলেন মা সহ দুই মেয়ে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুইজনকেই প্রথম তিন জনকে প্রথম শ্রেণীর সদর হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে ভর্তি করানো হয়। মা মেহেরুন নেছাকে ও ছোট মেয়ে হাফসা ইসলামকে প্রথমে ঢাকা বাণীটির আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। স্ত্রী-সন্তানের কথা মাথায় রেখে ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে প্রবাসী মাহবুবুল ইসলাম চলে আসেন দেশে। দেশে এসেও স্ত্রী ও ছোট সন্তানটিকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। শ্বাসনালী পুড়ে যায় দুইজন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ঘটনার ৫ দিন পর দুজনেই মারা যান। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া নিস্তব্ধ । এই নিস্তব্ধতা এবং শোকের ছায়া শুধু তাদের পরিবারে এসেছে এমনটি নয় । এই নিস্তব্ধতা এলাকার মানুষকে করেছে শোকাহত ।

—_——–ঘটনার বিবরণ -++++++

ফেনীর শফিক ম্যানসনে বিস্ফোরণ
মায়ের পর মেয়েরও মৃত্যু

ফেনীর শহরতলীর শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক এ ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ মা মেহেরুন নেছা (৪০) গত১১ মার্চ বুধবার দুপুরে মারা যাওয়ার পর মেয়ে হাফসা ইসলামও(১৪) রাতে মারা যান । বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আলমগীর হোসেন ।
মা মেহেরুন নেছার লাশ ময়না তদন্ত শেষে যখন দেশে আনার প্রস্তুতি চলছিল ঠিক সেদিন রাতেই মারা গেল মেয়ে হাফসা ইসলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটেএইভাবে নীরবে-নিভৃতে দুইটি মৃতদেহ দেহের পাশে থেকে নীরবে চোখের জল ফেলেছে হতভাগা হতভাগ্য পিতা ও স্বামী মাহাবুব ইসলাম। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত দেশে ফিরলেও দুজনকে হারালেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুকের মাধ্যমে রক্তের ব্যবস্থা এবং লাখ লাখ টাকা খরচ করেও ফেরাতে পারলেন না আগুনে দগ্ধ মেয়ে ও তার স্ত্রী মেহেরুনকে। বিধাতার লীলা খেলা বুকে এক টুকরো কষ্ট নিয়ে তাকে লাশ বহনকারী গাড়ি করে ফিরলেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের লক্ষীছড়া গ্রামের সেই হাজী আবুল কাশেম ভূঁইয়া বাড়িতে। শেষবারের মতো বিদায় নেয়া হয় তার বাড়ি থেকে যদিও কাউকে মা-মেয়ের লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। লাশ ফ্রিজার গাড়িতে রেখেই শেষ বিদায় ও মাপ চেয়ে নেয়া হয়। তারপর ওই সামাজ বটতলা লকিয়ত উল্ল্যাহ জামে মসজিদেই আঙ্গিনায় লাশ রেখে এশার নামাজ শেষ করে রাত সাড়ে আটটায় জানাজা নামাজের প্রস্তুতি চলছিল। মসজিদ ভর্তি শোকাচ্ছন্ন মানুষ, বটতলা লকিয়ত মসজিদের জামাত শেষ করে লাশ দুটি একে একে নামানো হলো। জানাজার নামাজে মুসল্লির ঢল নামে। দুই মিনিটের বক্তব্য আর এক মিনিটের জানাযা নামাজ শেষে হলো। চারদিকে পর্দা টানিয়ে দুই খাটিয়া করে মা-মেয়েকে দাফনের জন্য মসজিদের দক্ষিণ পাশে তাদের পারিবারিক কবর স্থানে নেয়া হলো । মা মেহেরুনের পায়ের নিচে বরাবর মেয়ে হাফসা ইসলামের কবর। চির নিদ্রায় শায়িত হলেন মা মেয়ে দুজন। মাহবুব ইসলাম প্রবাসীর স্বপ্নের মৃত্যু হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *