দল, চাল ও রোহিঙ্গা

শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের প্রথম তিন বছর বলতে গেলে ‘হেসেখেলে’ কেটেছে। বিরোধী দলের কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল না, বিএনপি জোটের তিন মাসের ‘অপরিণামদর্শী ও আত্মঘাতী’ অবরোধ ছাড়া। গণমাধ্যমও মোটামুটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছে, সমালোচনার ধার বাড়িয়ে সরকারের কোপানলে পড়তে চায়নি। তারপরও একটু এদিক-ওদিক হলেই সরকার ঘাড়ের ওপর খাঁড়া ঝুলিয়ে বলছে, ‘নড়চড় করা যাবে না।’
কিন্তু চতুর্থ বছরে না-পড়তেই সরকারের সামনে একের পর এক বিপদ এসে হাজির, যার বেশির ভাগ মানবসৃষ্ট, কিছুটা প্রাকৃতিক। চলতি বছরের এপ্রিলে হাওরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানিতে ডুবে গেলে ক্ষতি হয় লাখ লাখ একর জমির ফসল। তদন্তে দেখা যায়, ফসলডুবির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এবং দলীয় ঠিকাদারেরাই দায়ী। অনেকে সময়মতো বাঁধের কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়েছেন। রাঘববোয়ালদের হদিস না পেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন কয়েকজনকে পাকড়াও করেছে।
হাওরের বিপর্যয় না কাটতেই চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ধস দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। উন্মূল উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও মূলত মানবসৃষ্ট। প্রকৃতিকে ধ্বংস করলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবেই। আবার পাহাড়ধসের ক্ষত না শুকাতে ভয়াবহ বন্যার প্রকোপে বিপন্ন হয়ে পড়ে গোটা উত্তরাঞ্চলের জনজীবন। হাওর ও উত্তরাঞ্চলের বন্যায় ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং চালের মজুত তলানিতে এসে ঠেকে। কয়েক মাসের ব্যবধানে চালের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গত বছরের হিসাব ধরলে এই বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। এরপর মন্ত্রী-আমলারা দেশ-বিদেশে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অবস্থা এতটাই নাজুক যে যখন মিয়ানমার সরকার জাতিগত নিপীড়ন চালিয়ে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, তখন সেই সরকারের কাছেই চাল কিনতে খাদ্যমন্ত্রীকে ধরনা দিতে হলো। এখন তারা বলছে, আগের দামে চাল দেওয়া যাবে না। বেশি দাম দিতে হবে।

 সংকট উত্তরণে গত সপ্তাহে চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তিন মন্ত্রীর বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ব্যবসায়ীরা যেভাবে মন্ত্রীদের ওপর হম্বিতম্বি করলেন, তাতে মনে হলো সরকার আসলেই অসহায়। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো তাঁদের মানতে হয়েছে। এরপরও বাজারে চালের দাম কমবে কি না, কিংবা কমলেও কতটা কমবে সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কেননা ব্যবসায়ীরা যখন সরকারকে চালের মজুত নিয়ে চ্যালেঞ্জ করছেন, তখনই বিভিন্ন আড়তে অভিযান চালিয়ে চাল উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বন্যার জন্য উত্তরাঞ্চলে এবার আমনের ফলন কম হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই সময়ে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। তাহলে বাড়ল কেন? এর পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি থাকলে তাঁদের ধরা হচ্ছে না কেন? সেই অসাধুদের পেছনে কোন সাধুরা আছেন, তা খুঁজে বের করুন। অতীতে চালের দাম বৃদ্ধি কোনো সরকারের জন্যই স্বস্তিকর হয়নি। এখন লোকজন বলাবলি করছে, আওয়ামী লীগ ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলে ক্ষমতায় এলেও এখন মানুষ ৫০ টাকা কেজি চাল (মোটা) খাচ্ছে। চিকন চালের দাম আরও বেশি, ৭০ টাকা। আর চালের দাম বাড়লে নিম্নবিত্ত ও হতদরিদ্র মানুষগুলোই বেশি কষ্ট পায়।

২.
এই মুহূর্তে চালের দাম সরকারের মাথাব্যথার কারণ হলেও সব সময়ের জন্য দুশ্চিন্তা হলো—দল অর্থাৎ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা বিপর্যয়ে দলীয় মাস্তানি-দৌরাত্ম্য খানিকটা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়েছে বলা যাবে না।
২১ সেপ্টেম্বরে প্রথম আলোর খবর, ‘সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মী মাসুম হত্যা: সুলেমানের মতো টিটুও লাপাত্তা।’ গত বছর ১৬ আগস্ট খুন হন করিম বক্স মামুন। এ বছর ১৩ সেপ্টেম্বর খুন হন জাকারিয়া মাসুম। দুই মামলার প্রধান আসামিদ্বয় পলাতক। এখানে খুনের শিকার ও খুনি দুজনই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতা-কর্মী। এর আগে চট্টগ্রামে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের একাধিক নেতা-কর্মী খুন হন।
১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর খবর: কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের বাখইল গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর নাম শাহানুর রহমান (৪২)। ওই সংঘর্ষে এর আগে এনামুল হক (৪৫) ও বিল্লাল হোসেন (৪০) নামে দুজন খুন হয়েছেন। আর বগুড়ার তুফান-মতিনের ঘটনা তো গোয়েন্দা কাহিনিকেও হার মানায়। এক তুফান পরিস্থিতির চাপে পড়ে জেলে থাকলেও বহু তুফান আছে জেলখানার বাইরে।
গত ২২ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘থামছে না আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাত’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে কুমিল্লার মুরাদনগর ও নরসিংদীর রায়পুরায় ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে তিনজনের প্রাণ গেছে। এ সময়ে চট্টগ্রাম শহরে সুইমিংপুল নির্মাণ বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। কুমিল্লা উত্তর জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। কুমিল্লা মহানগরে সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও প্রবীণ নেতা আফজল খান পরিবারের দ্বন্দ্বও পুরোনো। অনেকের মতে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের মূলেও এই দ্বন্দ্ব কাজ করেছে।
দলীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমদ হত্যার দায়ে টাঙ্গাইলের সাংসদ আমানুর রহমান খানের বিচার হচ্ছে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে জেলা সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্বের জেরে নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা ও আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। কেবল টাঙ্গাইল বা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, সারা দেশেই আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীরা নানা দল–উপদলে বিভক্ত। আর এর পেছনে আছে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, হাট-ঘাট-টার্মিনালের টোল ও চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখল। ঢাকায় ময়লা–বাণিজ্য করেও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও প্রথম আলোর খবরে জানা যায়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ৬৩ বার সংঘাতে জড়িয়েছে। এসব সংঘাতে প্রাণ গেছে ১১ জনের। আহত হয়েছেন আরও ৯১৪ জন। গেল ইউপি নির্বাচনে যে দেড় শতাধিক মানুষ মারা গেছেন, তার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। এর আগে ইত্তেফাক–এর খবর: গত ৮ বছরে (২০০৯-২০১৬) সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত ১৮০ জন নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। এই সময়ে নিজেদের মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১২১টি। নির্বাচনের তারিখ যত কাছাকাছি আসবে, তৃণমূলে দলীয় কোন্দল তত বাড়বে বলে ধারণা করি।

৩.
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাকে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কথায় অতিশয়োক্তি নেই। কেননা আগে থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও সোয়া চার লাখ। আগে আসা শরণার্থীদের আমরা ফেরত পাঠাতে পারিনি। এবারের সংকটটি খুবই ভয়াবহ। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালাচ্ছে, যার সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনের তুলনা করা যায়।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে মিয়ানমারে যত রোহিঙ্গা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে বাংলাদেশে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৮-৭৯ সালে মিয়ানমারকে ভয় দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠিয়েছিলেন বলে মালয়েশিয়ায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক গণ–আদালতের বরাতে সহকর্মী মিজানুর রহমান খান জানিয়েছেন। কিন্তু এখন আর সেটি সম্ভব নয়। কেননা, পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিকভাবে যেসব ক্ষমতাধর দেশ আছে, তারা সবাই এখন মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ। কূটনীতিতে বন্ধুত্বের অপর নাম জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। কূটনীতিক অনুপ কুমার চাকমা প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অনেকেই আমাদের ভূয়সী প্রশংসা করবে। কিন্তু বিপদে পড়লে কাছে পাওয়া যাবে না।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো তাদের মিয়ানমারে ফেরত নেওয়া। মানবিক কারণে এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে জায়গা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের প্রশংসা করছে, সাধুবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু শুধু প্রশংসা আর সাধুবাদে এই জটিল সমস্যার সমাধান হবে না। সে জন্য শরণার্থীদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে হবে। আর মিয়ানমারকে রাজি
করাতে ভারত, চীন এমনকি রাশিয়াকেও পাশে পেতে হবে।
অনেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আলোচনার কথা বলেছিলেন। সেখানে আলোচনা হয়েছেও। কিন্তু জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে হয় না। সাধারণ পরিষদে দুই শতাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান কিংবা তাঁদের প্রতিনিধি নিজ নিজ দেশের স্বার্থের কথা বলবেন। তাঁদের বিচিত্রমুখী কথাবার্তায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি হারিয়ে না গেলেও খুব বেশি গুরুত্ব পাবে না। এ কারণেই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সব ফোরামে সমস্যাটি তোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সমস্যা সমাধানে অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ এবং বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের কথা বলেছেন; কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালা দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রস্তাব হিসেবে এগুলো চমৎকার। কিন্তু মিয়ানমার নামক বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? এসব প্রস্তাবের পক্ষে শুধু জনমত গড়ে তুললেই হবে না, মিয়ানমার যাতে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়, সেই দুরূহ কাজটিই আমাদের করতে হবে। বিশ্বকে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন দলের বিশালকায় প্রতিনিধিদল একবার বেইজিং ও একবার দিল্লি সফর করলেই কাজ হয়ে যাবে।
তাহলে ১৯৭১ সালে কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছিলেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *