জাফর ইমাম বীর বিক্রম অবিস্মরণীয় যুদ্ধের কিংবদন্তী যোদ্ধাঃ

৪ঠা ডিসেম্বর,২০২০(শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,ঢাকা)-

ডিসেম্বর বিজয়ের মাস,বাংগালীর জাতীয় জীবনে ডিসেম্বর আসে এক অনন্য চেতনার ধারক হয়ে। ৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ফেনী মুক্ত দিবস।প্রতিবছর ফেনী মুক্তির এই দিনটিতে শ্রদ্ধাভরে এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে স্মরণ,শ্রদ্ধা এবং গৌরবগাঁথা আলোচনা চলে ফেনী জেলায়।২ নং সাব সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমাম বীর বিক্রমের নেতৃত্বে বিজয়ীর বেশে মুক্তিযোদ্ধার ৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ফেনী শহরে প্রবেশ করে।আকাশ,বাতাস প্রকম্পিত হয় জয়বাংলা শ্লোগানে।সাধারন জনতা সেদিন রাস্তায় নেমে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের বরণ করতে। জাফর ইমামের অসম সাহসিকতা ও কৌশলী নেতৃত্বে তুলনামূলক অনেক কম শক্তির মুক্তিযোদ্ধারা আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর সাথে ‘বিলোনিয়া ব্যাটল’-এ কল্পনাতীত বিজয় অর্জন করেছিলো।এই খন্ড যুদ্ধের রণকৌশল পৃথিবীর অনেক দেশের সামরিক বাহিনীর পঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত।

যুদ্ধের আগের বছর। জাফর ইমাম তখন ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার অফিসার হিসেবে পাকিস্তানের খারিয়ান সেনানিবাসে ৯ম এফ এফ পদাতিক রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। সে বছর ইউনিটের অধিনায়ক তার সম্পর্কে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এ.সি.আর) উল্লেখ করেছিলেন,“This officer has got a trend of provincialism in his mind. He can slip off the track any time if not guided properly.’ অর্থাৎ এই অফিসারের মনে স্বদেশী টান আছে। ঠিকমত গাইড না করা গেলে সে যে কোন সময় ট্র্যাকের বাইরে চলে যেতে পারে।’
রিপোর্ট দেখে জাফর ইমাম ঘাবড়ে গেলেন। এই রিপোর্টটি যদি পিন্ডিতে হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়, তাহলে সরাসরি চাকরী চলে যাবে। তিনি গিয়ে তার পাঠান সিও কে অনেক আকুতি মিনতি করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এ.সি .আর এর ভাষা পরিবর্তন করে স্বাক্ষর করলেন। সিও তখন জাফর ইমামকে উপদেশ দিলেন যে সামরিক বাহিনীতে চাকরীরত অবস্থায় কোন রাজনীতি অথবা কোন পক্ষে বিপক্ষে না যেতে এবং অহেতুক কোন আলোচনা-সমালোচনা না করতে।
৭০ এর শেষের দিকে জাফর ইমাম চেষ্টা তদবির করে বদলি হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে ২৪ এফ এফ রেজিমেন্টে যোগ দিলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তর্জনী উঁচিয়ে সবুজ আগুন জ্বেলে দিলেন ৭ কোটি বাঙালির হৃদয়ে। বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’ সে আগুন জাফর ইমামের মনে তীব্রতর হয়ে উঠল।
২৫ শে মার্চ ১৯৭১, শুরু হল জান্তা ইয়াহিয়ার ‘অপারেশন সার্চলাইট’’। ২৬শে মার্চ আরো কয়েকজন বাঙালী অফিসারসহ তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে চট্টগ্রাম থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে পাঠানো হয়। কিন্তু জাফর ইমাম আগেভাগেই নিজের পথ ঠিক করে নিয়েছিলেন। হেলিকপ্টার বিমানবন্দরে অবতরণের পর পরই তিনি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়লেন। ঝটপট সামরিক ইউনিফর্ম খুলে সিভিল পোষাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এয়ারপোর্ট এর গেটের বাইরে এসে একটা বেবি ট্যাক্সিতে উঠে পড়লেন…
সে ইউনিট কমান্ডারের কথাই সত্য হয়েছিল, তিনি ট্র্যাকের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলার মাটিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি মুক্তির সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। প্রিয় মাতৃকার স্বাধীনতা রক্ষা করতে যুদ্ধ সংগঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অকুতোভয় এ দেশপ্রেমিক এ সেনা কর্মকর্তা।
কিন্তু পাকিস্তান বাহিনী ট্র্যাকচ্যুত এ বাঙালি অফিসারের পিছু ছাড়ল না। তার খোঁজে একাত্তরের এপ্রিলের এক রাতে হানা দিল এলিফ্যান্ট রোডে। অল্পের জন্য সে যাত্রা বেঁচে যান তিনি। পালিয়ে চলে এসে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
ক্যাপ্টেন (পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) জাফর ইমাম, বীরবিক্রম ডাক নাম হুমায়ুন, দুর্ধর্ষ এক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন একাত্তরে। হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য মূর্তিমান ত্রাস। যুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তানি প্রশিক্ষিত পেশাদার সামরিক বাহিনী সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে এ অকুতোভয় বাঙালি সেনা অফিসারকে পদানত করতে, কিন্তু পারে নি।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ঢাকা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন জাফর ইমাম। পরে মেজর খালেদ মোশাররফ নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনীর সামরিক ব্রিগেড ‘কে’ ফোর্সের দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রাক্তন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশ, বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি গঠন করেছিলেন দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর ফোর্সের অধীন পুনর্গঠিত এ রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। যুদ্ধের পুরো ৭ মাস জুড়ে জাফর ইমাম পরিণত হন ফেনী সন্নিহিত বিলোনিয়া অঞ্চলে পাকিস্তানী হানাদারদের ত্রাসে। তিনি পরিণত হন অবস্মরনীয় যুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধায়।
জাফর ইমাম ছাড়াও গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন একই পরিবারের ডাঃ হাসান ইমাম(আমেরিকা প্রবাসী),শেখ মহিউদ্দিন চৌধুরী(অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র এ,এস,পি)এবং শেখ কামাল উদ্দিন চৌধুরী এবং সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন শেখ নিজামউদ্দিন চৌধুরী।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *