একজন কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ চিত্তরঞ্জন সাহা:

শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,(২৫শে জুলাই ২০২০),ঢাকাঃ

বৃহত্তর নোয়াখালীর সেনবাগের অধিবাসী হয়েও নিজেদের এই সূর্যসন্তানকে আমরা অনেকেই হয়তো ঠিকভাবে জানিনা।
চিত্তরঞ্জন সাহার গ্রামের পরিচয়টা পরে লিখছি; আগে উনার কৃতিত্বগুলোর কিছু অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবদি বাংলা একাডেমির পরিচালনায় জাঁকজমকপূর্ণ যে বইমেলার আয়োজন হয়ে থাকে, তার একমাত্র উদ্যোক্তা ছিলেন এই চিত্তরঞ্জন সাহা।
১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মূদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।

চিত্তরঞ্জন সাহা ১৯২৭ সালে বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম কৈলাশ চন্দ্র সাহা এবং মায়ের নাম তীর্থবাসী সাহা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে চিত্তরঞ্জন ছিলেন দ্বিতীয়। ঐতিহ্যগতভাবে তাঁদের পরিবারে ছিল কাপড়ের ব্যবসা এবং তারা পুরনো ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ১৯৪৩ সালে মোহাম্মদপুর রামেন্দ্র মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৮ সালে চৌমুহনী এসএ কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ব্যবসায়ের পারিবারিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে চৌমুহনীতে বইয়ের দোকান পরিচালনার মধ্য দিয়ে শুরু করেন পুস্তক ব্যবসায়। ঐ দোকানে প্রধানত স্কুলপাঠ্য বই ও নোট বই বিক্রি হতো। কিছুকাল পরে বাসন্তী প্রেস নামে একটি ছাপাখানা ক্রয় করেন। তিনি এর নাম বদলে রাখেন ছাপাঘর। পাশাপাশি ‘বাঁধাই ঘর’ নামে একটি পুস্তক বাঁধাই প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারিত করেন। এখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঢাকা প্রেস’ নামে একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। আরো প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রন্থঘর’ নামে একটি বইয়ের দোকান। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পাঠ্যপুস্তক ও নোটবইয়ের প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘর লিমিটেড।

মুক্তিযুদ্ধলালীন সময়ে কলকাতায় তিনি বাংলাদেশী সৃজনশীল লেখকদের বই প্রকাশের উদ্যেগ নেন। সূচনা হল স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ মুক্তধারা । এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুটি প্রকাশনা ছিল ‘বাংলাদেশ কথা কয়’ এবং ‘রক্তাক্ত বাংলা’ নামে দুটি সংকলন গ্রন্থ। চিত্রনির্মাতা ও সাহিত্যিক জহির রায়হান, সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি-ঔপন্যাসিক আহমদ ছফাসহ অনেক লেখক-সাংবাদিক কবি যুক্ত হয়েছিলেন চিত্তবাবুর প্রচেষ্টার সঙ্গে। কলকাতার মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের ৩২টি বই। ঐ ৩২টি বই ছিল বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অভিব্যক্তি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউসের সামনে বটতলায় একটুকরো চটের উপর কলকাতা থেকে আনা ৩২ টি বই সাজিয়ে তিনি প্রথম বই মেলার সূচনা করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত একাই তিনি বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে মেলা চালিয়ে যান। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমীর মহা পরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমীকে মেলার সাথে সরাসরি সংযুক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি । এ সংস্থাটিও সংগঠিত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।

অর্জন:
২০০৫ সালে ‘একুশে পদক’ শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ২০০৫ সালে ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’
১৯৮৬ সালে ‘থিয়েটারের শ্রদ্ধাঞ্জলী সম্মাননা’
১৯৯৫ সালে ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’ আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা
১৯৯৬ সালে ‘বনলতা সাহিত্য পুরস্কার’
১৯৯৭ সালে ‘সেরা প্রকাশক’ স্বর্ণপদক।
২০০৩ সালে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রতা সমিতির সম্মাননা।
২০০৮ সালে সেনবাগে প্রগতি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কর্তৃক মরোনত্তর ‘প্রগতি পদক’ দেয়া হয় তাঁকে।

২০০৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বই প্রকাশনার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাবাজারে আনা হয়। সেদিন তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাবাজার, নর্থব্রুক হল রোড এবং প্যারিদাস রোডের সব প্রকাশনা সংস্থা ও বই বিক্রির দোকান বন্ধ রাখা হয়েছিল। চিত্তরঞ্জন সাহার জন্মস্থানে তাঁর শেষকৃত্য করা হয়।

চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন গ্রন্থ নির্মাণের কারিগর।
তিনি সেনবাগের গর্ব।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিপ্লবের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে চিত্তরঞ্জন সাহা চির অমর হয়ে থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *