একজন অনলাইন সাংবাদিকের যোগ্যতা ও গুণাবলী

হাতে হাতে স্মার্টফোন আর ঘরে ঘরে ইন্টারনেটের বদলে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের হিড়িক পড়েছে। কিন্তু পেশাদারী সংবাদ মাধ্যম হাতে গোণা দু চারটি। এর কারণ হলো বেশীরভাগ লোক নিউজপোর্টাল খুলেছেন ওয়েবসাইটে ভিজিটর বাড়ানোর জন্য। আর পেশাদারী সাংবাকিরা ভালো করার সুযোগ থাকলেও তারা হিমসিম খাচ্ছেন পুরো আর্থ সামাজিক ও মিডিয়া পরিষ্থিতির কারণে। নানারকম বাঁধাবিপত্তির পাশাপাশি আছে পূজি সংকট ও দক্ষ কর্মীর অভাব। আমাদের এখানে সংবাদকর্মীদের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশই পেশাদারী ডিগ্রি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। যদিও যারা দীর্ঘদিন কাজ করে অভিজ্ঞতার কারণে তাদের শিক্ষার ঝুলি পূর্ণ হয়। কিন্তু নতুনরা সত্যিই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এজন্য পুরো সংবাদ পড়া দরকার হয়না। সংবাদের শিরোনামেই বোঝা যাচ্ছে কার অবস্থা কতটা কাহিল। তাই এ বিষয়ে লিখার তাড়না অনুভব করছি।

 

১. নিউজ সেন্স: এটা খুব একটা মারাত্বক জিনিস কোনটি সংবাদ আর কোনটি সংবাদ নয়, এই অনুভতি প্রতিটি মিডিয়া কর্মীর থাকা জরুরী।

যেমন: একজন কৃষক গ্রাম থেকে ঢাকা এসেছেন এটা সংবাদ নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গ্রামে এক কৃষকের বাড়িতে গেছেন এটা সংবাদ।

২. সচেতনতা: দেশ ও দেশের বা্িইরে কোথায় কি হচ্ছে কিভাবে বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটছে এবিষয়ে সচেতন থাকা খুবই সাধারণ যোগ্যতা একজন সংবাদকর্মীর।

যেমন: একজন সংবাদকর্মী জানেবেন যে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট  কে? শাষনতন্ত্র কি? তিনি এও জানবেন যে যশোর ৫ আসনে কোন দলের প্রাথী বিগত নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন।
৩. লেখালেখির যোগ্যতা: এ বিষয়ে কারো নূনতম দখল না থাকলে। গরুর রচনা লেখার জ্ঞান দিয়ে কারে সাংবাদিক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

যেমন: পরীক্ষার খাতায় সবাই বাংলায় লিখে পাশ করে এসেছে। কিন্তু সংবাদ লেখার নিজস্ব নিয়মকানুন বা ব্যাকরণ রয়েছে। সেটা মেনে সংবাদ লিখতে হয়। যেমন সংবাদের প্রথম ১৮-২৫ শব্দের মধ্যে পুরা সংবাদটির সামারিন নিয়ে আসতে হয়।
৪. ভাষাগত দক্ষতা: যেভাষায় লিখবেন সে ভাষাটির উপর দখল থাকা চাই। থাকাচাই অন্যভাষা বিশেষ করে   ্ইংরেজীর উপর জ্ঞান। ভাষার উপর দখল থাকা জরুরী আমদের মুখের ভাষা যেহেতু সাহিত্যের বিষয় নয়।

যেমন: আমরা অনেক সময় বলি সহসা সংলাপের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সহসা শব্দের অর্থ হঠাৎ। তাহলে হঠাৎ সংলাপের সম্ভাবনা নেই। কথাটা কেমন হলো? এজন্য এখানে শব্দটি ভুল। আমরা বলি তুমি জঘন্য কাজ করেছো। এখানে জঘন্য শব্দটির ভুল প্রয়োগ করা হয়েছে। আমরা বলি মারামারি হওয়ার সমভাবনা আছে। এখানে হবে মারামারি হওয়ার আশংকা আছে। সম্ভাবনা শব্দটি মূলত ইতিবাচক অর্থে। এরকম অসংখ্য শব্দের আমরা ভুল প্রয়োগ করি কথা বলার সময়। কিন্তু লিখার সময় এসব ভুল লেখা কাম্য নয়।
৫. চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ও ঝুকিনেয়া: সংবাদ পত্র অফিসে কাজের ভলিওম হিসেব হয়না। বাইরে কখন কাকে কোন বিটে যাওয়ার দরকার হয় তাও সেনটেন করা যায়না। তাই অতিরিক্ত চাপটা নেয়ার ক্ষমতা এবং মানষিকতা দুটোই থাকতে হয়।

যেমন: যেমন রাত বারোটায় মতিঝিলে বোমা ফুটেছে এসংবাদ শোনার পর সেখানে চলে যাওয়া সংবাদকর্মীর পেশাগত দায়িত্ব। অথবা বোমা ফোটার আশংকা থাকলেও সেখানে যেতে হতে পারে।

৬. বানান দ্ক্ষতা: বানানের কথা আলাদা করে না বললেই নয়। বিশেষকরে বাংলা বানানের যে হাল দেখা যায়। তাতে এই জ্ঞান না নিয়ে নিজেকে হাসির পাত্র বানাবেন না কেউ পাশাপাশি নিজের ভাষাটাকেও বিদঘুটেভাবে উপস্থাপনার অতো দায় দেখানো ঠিক নয়। যদি দায় ঠেকে যা করার সঠিক ভাবে করা উচিৎ।

যেমন: বাংলা বানানের হযবরল অবস্থায় কোথায় ই কার কোথা ঈ কার হবে এগুলো জানা থাকা জরূরী। জানেতে হবে ণত্ব বিধান ও ষত্ববিধানসহ বানানের নিয়ম।
৭. সবার সঙ্গে ভাব জমানোর ক্ষমতা : সংবাদের জন্য একজন সংবাদকর্মীকে বিভিন্ন সোর্স এর উপর নির্ভর করতে হয়। তার সোর্স থোকে বাসাবাড়ূর কাজের বুয়া থেকে সংসদ ভবনের কেরানী পর্যন্ত। তাই মানুষের সাথে সর্পম্ক রক্ষার বিষয়টি তার জন্য অতীব দরকারী।

যেমন: কাল স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর বাসায় চুরি হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী সেটা চেপে যাচ্ছেন। এই মুহুর্তে মন্ত্রীর বাড়ীর কোনো লোকের সাথে যোগাযোগ হলে সহজে ঘটনার সত্যতা নিরুপন করা যায়।

৮. সময়ানুবর্তিতা সংবাদকর্মীর অপরীহার্য যোগ্যতা: প্রতিটি সংবাদ একটি সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সময় অতিবাহিত হলে অনেক ঘটনাই আর সংবাদ থাকেনা। এজন্য একজন সংবাদকর্মীকে প্রতি পদে সময়ের মূল্য দিতে হবে। সংবাদ জগতে একটি ঘটনা ঘটার পর কে আগে জনতার কাছে নিয়ে আসতে পারলো এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যেমন: রাত একটায় সীমান্তের কাছে জঙ্গি ধরা পড়েছে। কিন্তু থানায় আনার পথে জঙ্গি ছিনতাই হয়ে গেছে। পরে দুপুর বারোটায় সে আবার ধরে পড়েছে। এখন একজন সংবাদ কর্মী সকালে ঘুস থেকে উঠে রাত বারোটার ধরা পড়ার ঘটনাটা লিখলেন। ততক্ষনে অন্য পোর্টালের সংবাদ অনুযায়ী জঙ্হি পালিয়ে গেছে। তিনি এটা শুনে দুপরে লিখলেন যে জঙ্গি ছিনতািই হয়েছে । কিন্তু ততক্ষনে সে আবার ধরা পড়েছে। তাহলে বিষয়েটা বোঝা গেল নিশ্চই।

৯.পেশাগত দক্ষতা: সংবাদপত্র একটি পেশা, এর নির্দিস্ট কার্যপ্রণালী আছে, আছে পরিভাষা, আছে বিধিবিধান। এগুলো জানা এবং মানার উপর সংবাদকর্মীর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা নির্ভরশীল।

যেমন: সাংদিকতার কিছু নিয়ম রয়েছে। কিভাবে শিরোনাম লিখতে হয়। কিভাবে প্রথম অংশ সাজাতে হয় কিভাবে বিস্তারিত সংবাদ পরিবেশন করতে হয়। তা না জেনে একজন লিখেলেন বিমান ক্রাশ হতাহত ৭০। আসল ঘটনা হলো কোনো লোক বেচে আসেনি সবাই নিহত হয়েছে।তাহলে তার এই শিরোনামে মূল চিত্রটা ফুটে উঠেনি।

১০. পেশাদার সৎ ও দেশপ্রেমিক: পেশাদিারিত্ব প্রতিটি পেশাই সফলতার একটা নিয়ামক, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। সেইসাথে সংবাদকর্মীকে সৎ ও দেশপ্রেমিক নাহলে কিখনো সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করা সম্বব হয়না।

যেমন: সাংবাদিকতায় পেশায় থাকে নানারকম চাপ ও প্রলোভন। সততা ও দায়িত্বশীলতা না থাকলে সঠিকভাবে দায়িত্বপালনে অবিচল থাকা যায়না।

  1. প্রযুক্তিজ্ঞান: যেহেতু প্রতিটি মুহুর্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন সংবাদকর্মীকে কাজ করতে হয়। সেজন্য তার প্রাথমিক প্রাথমিক প্রযুক্তিজ্ঞান যেমন কম্পিউটার অপারেটটিং, লেখালেখি, অনলাইনে সংবাদ পোস্ট করা, ছবি তোলা, ছবি সম্পাদনা এই জ্ঞানগুলো থাকা দরকার।

যেমন: একজন সংবাদকর্মী যশোর বেনাপোল থেকে সংবাদ সংগ্রহ করলো কিন্তু প্রযুক্তি জ্ঞানের কারনে তিনি সেটা পাঠাতে পারেননি। আর অন্যসব পত্রিকা সংবাদটি ছাপলেও তার পত্রিকা সেটি ধরাতে পারলোনা।

১২. সম্পাদনা জ্ঞান: রিপোটিং এবং এডিটিং দুটো আলাদা বিভাগ, আলাদা ধরনের কাজ। যদিও সাংবাদিক এবং সম্পাদক দুইজনেরই সংবাদ ও সাংবাদিকতায় দখল থাকতে হয়। কিন্ত ‍একজন অনলাইন সংবাদপ্রতিনিধির সংবাদ সম্পাদনার উপর পুরো দখল থাকতে হয়। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সময়ের গুরুত্বের কারণে প্রথমে সংবাদ পোস্ট হয়ে যায়। পরে এডিট প্যানেল হয়তো এডিট করে। এজন্য সঅনলাইন সংবাদকমীংর এডিটিং নলেজ থাকা দরকার। কারণ প্রাথমিক ভাবে তার নিজের সংবাদ নিজেকেই এডিট করতে হয়। মনে রাখবেন এটা একটা টেকনিক্যাল বিষয় প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা ছাড়া এটা পোক্ত হয়না। দুটো হলে আরো ভালো।

যেমন: সংবাদ যেমন কোন মামুলি লেখা নয়। সংবাদ আবার সাহিত্যকর্ম্ও নয়। এজন্য একজন সম্পাদক কেটেছেটে সংবাদকে মানুষ বানান মানে সঠিক সংবাদ বানান। এই যোগ্যতাটিও অনলাইন সংবাদকর্মীর থাকা দরকার। সংবাদ লেখার সময় অনেক বিষয় বাদ পড়ে যায় পরে সেটা যোগ করতে হয়। আবার অনেক অপ্রযোজনীয় বিষয় চলে আসে পরে বাস্তবতার আলোকে বাদ দিতে হয়।

  1. সবসময় আপডেট: একজন অনলাইন সাংবাদিককে সবসময় সব বিষয়ের অন্তত তিনি যে বিটে কাজ করেন সে বিষয়ের সর্বশেষ আপডেট জানতে হয়। কারণ অসংখ্য সংবাা মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ড শত শত সংবাদ পরিবেশন করছে। একটু অমনোযোগী হলে তিনি যেকোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু মিস করতে পারেন।

যেমন: একজন সংবাদকর্মী রাজনৈতিক বিট করেন অথবা বিরোধীদলীয় বিট করেন। এখন যে দলের বিট করেন। তাকে সে দলের নাড়ী নক্ষত্র জানতে হয়। দেখাগেল তাকে কেউ ওই দলের নাম করে একটা ভুল তথ্য দিলেন। তিনি সেই লোককে চিনতে না পেরে তার কথা দলের কথা ভেবে চেপে দিলেন। পরের দিন তার বিরুদ্ধে ওই দল থেকে হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগ করা হলো। সূতরাং যিনি যা নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন। তাকে সেটা ভালো বুঝতে হবে।

  1. বহুমূখী প্রতিভা: একজন অনলঅইন সংবাদকর্মীকে তার বহুমূখী প্রতিভা তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে। তিনি যদি ফটো তোলা ও এডিটিং জানেন তার ছবিটি অন্যদের চেয়ে ভালো থাকবে।

যেমন: তিনি যতদ গ্রাফিক্স এর কাজ জানেন তাহলে প্রয়োজনে তিনি যেকোনো ইলাস্ট্রেশন নিউজের সাথে দিতে পারবেন। তিনি যদি ভিডিওগ্রাফার ও এডিটর হন তাহলে তার সংবাদের সাথে তিনি ভিডিও সংযুক্ত করে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারেন। তিনি যদি এনিমেশেনর কাজ জানেন কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ইমেজ মিস করলে তিনি একটা এনিমেশন কিংবা ফ্লাশ ডিজাইন সংযুক্ত করে এর আকর্ষণ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতায় নিজেকে সহজে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

১৫. তথ্য ও সোর্সভান্ডার: একটি নিউজকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্য অনেক উপাদান প্রয়োজন হয়। এসব উপাদান হাতের কাছে থাকলে একজন অনলাইন জার্নালিস্ট অকুস্থলে বসেই পরিপূর্ণ সংবাদ তৈরীর কৃতিত্ব নিতে পারেন সহজেই।

যেমন: ফেনীর এক প্রত্যন্ত অঞ্ছলে এক কিশোরীকে দোররা মারা হলো গ্রাম্য সালিশে। এখন সংবাদকর্মীর দায়িত্ব হলো সেখান থেকে সংবাদ এর বিস্তারিত পোস্ট করা। তখন তারে কাছে অনেক লোকের ফোন নং থাকতে হবে। তিনি প্রথম ভিকটিম, অভিযুক্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান নেবেন। তারপর চেয়ারম্যান, থানার ওসি। তারপর তিনি একজন মুফতির কাছে জানবেন ফতোয়া কি? এটা কার দেয়ার অধিকার আছে আর কার আছে প্রয়োগের ক্ষমতা। সর্বশেষ তিনি একজন সমাজবিজ্ঞানী ও শীর্ষ আলেমেরে মতামত নেবেন।

 তো এরকম পরিস্থিতিতে কোনকিছু না বুঝে না জেনে নাশুনে কেবল ঘরে বসে সাংবাদিকতা করার লোভে অনলাইন নিউজ পোরটাল খুলে অন্যের সংবাদ কপি পেস্ট করার মাঝে কি আনন্দ আছে বিষয়টা আমার বোধের একেবারেই অঘোচর।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *