আমাদের হুমায়ূন এর গল্পঃ

৫ই ডিসেম্বর,২০২০(শেখ তাজউদ্দিন চৌধুরী,ঢাকা)-

রাত পোহালেই ৬ই ডিসেম্বর,ফেনী মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী ফেনী-বিলোনিয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ফেনী থেকে পালিয়ে যায়। ৬ই ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ে এই অঞ্চলে। ২নং সাব সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমাম বীর বিক্রমের অকুতোভয় যুদ্ধ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় সেদিন।জাফর ইমাম বীর বিক্রমকে নিয়ে সবুজ ভুঁইয়ার লেখাটি ফেনীর তালাশের পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম।

জাফর ইমামের পৈতৃক বাড়ি ফেনী জেলার ফেনী পৌর এলাকায়। তাঁর গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার ফুলগাজী থানার নোয়াপুর গ্রামে। বাবার নাম শেখ ওয়াহিদুল্লাহ চৌধুরী এবং মায়ের নাম আজমেরি বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম নূরমহল বেগম। তাঁদের কোনো সন্তান নেই। জাফর ইমামের ডাক নাম হুমায়ুন। তিনি ফেনী পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন।
জাফর ইমাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা যিনি দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদের সাবেক মন্ত্রী ছিলেন।
জাফর ইমাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ঢাকা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। পরে দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর কে ফোর্সের অধীন পুনর্গঠিত ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্বও দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফেনী জেলার অন্তর্গত বিলোনিয়া এলাকা মুক্ত ছিল। এরপর এই এলাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখল করে। বিভিন্ন স্থানে ছিল তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান। ১৬ মাইল লম্বা এবং ছয় মাইল প্রস্থ সরু এ ভূখণ্ড এলাকাটি অনেকটা উপদ্বীপের মতো। প্রায় গোটা এলাকাই ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এর তিন দিকেই ভারত সীমান্ত।
মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিলোনিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করেন। সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন জাফর ইমাম। অবরোধের কাজটি শুরু হয় রাতে। তখন ছিলো শীতকাল। মুহুরী নদী ও চিলনীয়া নদীর কোথাও বুকপানি, কোথাও কোমরপানি কোথাও বা পিচ্ছিল রাস্তার বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে মুক্তিযোদ্ধারা। ভোর হওয়ার আগেই মুক্তিযোদ্ধারা সবাই নির্ধারিত স্থানে হাজির হয়। শত্রুদের পরশুরাম ও চিথলিয়া ঘাঁটি পুরোপুরি এ মুক্তিযোদ্ধা দলের অবরোধের মধ্যে আটকা পড়ে।
চিথলিয়া ঘাঁটি থেকে যাতে কোনো প্রকার আক্রমণ না আসতে পারে তার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ৯ নভেম্বর সকাল থেকে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। শত্রুরা সারা দিন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন পজিশনের ওপর আক্রমণ চালায়। জবাবও দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে। পরে শত্রুরা পরশুরাম ঘাঁটি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে। এই আক্রমণ ছিল অতি ভয়ংকর। মুক্তিযোদ্ধারা তার পাল্টা জবাব দিতে থাকল। এ আক্রমণে শত্রুরা এমনভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জালে আটকা পড়ে যে তাদের বের হওয়ার কোনো পথই আর বাকি থাকলো না।
পরদিন সারা দিনই যুদ্ধ চলল। বেলা চারটার দিকে শত্রুরা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। ভারি কোন অস্ত্র না থাকলেও এলএমজি ব্যবহার করে একটি বিমান আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। কোনো যুদ্ধের ইতিহাসে এলএমজি দিয়ে এর আগে এভাবে বিমান ভূপাতিত করা হয়নি। আসুন আমরা তাকে সম্মানের প্রথম কাতারে সামিল করি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *