অতি লোভে পেঁয়াজ পচছে আড়তেঃ

১৯শে নভেম্বর,২০২০(ফেনীর তালাশ ডেস্ক)-

প্রতিদিন দাম কমছে পেঁয়াজের। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তগুলো পেঁয়াজে সয়লাব হলেও ক্রেতা নেই। কেনা দামের চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতিতে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আড়তদার ও আমদানিকারকদের প্রতিনিধিরা। আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ পেঁয়াজে অঙ্কুর গজিয়েছে; পচনও ধরেছে। ক্ষুব্ধ আড়তদাররা বলছেন, পান, লোহা ও কাপড়ের ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের ব্যবসা শুরু করায় বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন গতকাল বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারিতে প্রতি কেজি তুরস্ক ও চীনের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকা, পাকিস্তান ৩৫, মিসর ৩০, মিয়ানমার ৩৫ এবং দেশি পেঁয়াজ ৪৫-৫০ টাকার মধ্যে। এছাড়া পচা পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন কিংবা শ্রমিক খরচ নির্বাহ করতে বস্তাপ্রতি ১০ টাকা কিংবা কেজিতে ১০ টাকায় বিক্রি করছেন কেউ কেউ।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। তখন পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।গত সপ্তাহে আমাদের তুরস্ক থেকে আমদানি করা এক কনটেইনার পেঁয়াজ পচে যায়। পরে ওই পেঁয়াজের অর্ধেক ১০ টাকা দরে বিক্রি করে বাকিগুলো ফেলে দিয়েছি। এর ফলে কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।’

খাতুনগঞ্জে আমদানিকারকরা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের বুকিং রেট ৪০০ থেকে ৭০০ ডলার। কিন্তু দেশে পেঁয়াজের দাম কম। ফলে লোকসান দিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ যেসব পেঁয়াজ বাজারে ঢুকছে তার বিক্রি কম হচ্ছে। বিক্রি না হলে গাড়িতে কিংবা গুদামে পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। আমরা তুরস্কের পেঁয়াজ ২০ টাকায় ছেড়ে দিচ্ছি অথচ আমাদের কেনা ছিল ৪৫ টাকা।’

খাতুনগঞ্জের আরেক আড়তদার বলেন, ‘আড়তভরা পেঁয়াজ কিন্তু ক্রেতা কম। বার্মার পেঁয়াজ গতকাল ৪০-৪২ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন তা ৩৫ টাকা। এক দিনের ব্যবধানে চীনা পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ৮ টাকা। যেসব দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে সেখানকার ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের পেঁয়াজ দিচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ না চেনার কারণে নিম্নমানের পেঁয়াজ এসে বাজার সয়লাব। এসব পেঁয়াজ দেশে আসতে আসতে পচে যায়। গত বছরের মতো দাম বাড়বে এমন লোভে যে যেভাবে পারছে বিভিন্ন দেশ থেকে একেক ধরনের পেঁয়াজ আমদানি করিয়েছে। ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় আমাদের দেশে এমন সংকট দেখানো হয়েছে যাতে অন্যান্য দেশ নিম্নমানের পেঁয়াজ সরবরাহ করেছে।’

চাক্তাই খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘পেঁয়াজ এলসি করার পর বন্দরে আসতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। ফলে পেঁয়াজ পচে গেছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে সব দেশের পেঁয়াজের চাহিদা একরকম নয়। এখানে তুরস্ক-মিসরের পেঁয়াজে যেমন সবার চাহিদা নেই তেমনি পাকিস্তান-বার্মার চাহিদা একেকটি অঞ্চলে একেক রকম। ফলে যেসব পেঁয়াজের চাহিদা কম সেগুলো পচে যাচ্ছে। এসি কনটেইনারে আসা আমদানি করা পেঁয়াজে অঙ্কুর হয়ে যাচ্ছে। আর নন এসি কনটেইনারে আসা অনেক পেঁয়াজ অতিগরমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অপরিপক্বতা এবং অধিক লোভের কারণে বাজারে এমন পরিস্থিতি। প্রতিদিন ট্রাক আসছে অথচ বেশিরভাগ আড়তে পেঁয়াজ মজুদ করার জায়গা নেই।’

খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেটর আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে দাম ৩০০ টাকায় যায়। সেবার দামের পরিস্থিতি দেখে এবার অনেকে লোভ করেছিল। তাই এবারও ভারত পেঁয়াজ বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহা ব্যবসায়ী, কাপড় ব্যবসায়ী, পান ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ে। মৌসুমি এসব ব্যবসায়ীর কারণে অত্যধিক পেঁয়াজ আমদানি হয়। তবে এবার দাম কম তারপর পেঁয়াজ পচা শুরু করেছে। এমন অবস্থা যে পচা পেঁয়াজ ডাস্টবিনে ফেলার জন্য শ্রমিক খরচ কমাতে বস্তা ১০ টাকা কিংবা কেজি ১০ টাকায়ও গত দুদিন বিক্রি হয়েছে।’

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত এক মাসে ৩৩৬টি ছাড়পত্র ইস্যুর মাধ্যমে ৪২ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ দেশে আমদানি হয়েছে। আর পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় তা বন্দরে আসার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাড় করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *